নিজস্ব প্রতিবেদক || নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধের বাড়তি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। বুধবার (২৮ অক্টোবর) এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা তুলেছে সরকার। এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিলের চারটি নিলামে উঠেছে ২০ হাজার কোটি টাকা। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে উঠেছে ১২ হাজার কোটি টাকা, ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ৮ হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আজকের নিলামে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ উঠলে অক্টোবরে এসব উপকরণের মাধ্যমে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মাসে এটিই সর্বোচ্চ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও বিল-বন্ডের নিলামে বড় অঙ্কের অর্থ তুলেছে সরকার। জুলাইয়ে তোলা হয় ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডাকা হয়েছে।
আগামী রবিবার (১ নভেম্বর) নতুন কাঠামোয় অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বকেয়াও পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
ঋণের বড় অংশ পুরোনো দেনা শোধে
সরকার সাধারণত ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল এবং বিভিন্ন মেয়াদের ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়। রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ব্যবধান তৈরি হলে স্বল্পমেয়াদি চাহিদা মেটাতে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলও ছাড়া হয়।
তবে বিল ও বন্ডের নিলামে তোলা পুরো অর্থ সরকারের নতুন বা নিট ঋণ নয়। এর বড় অংশ চলে যায় মেয়াদপূর্তিতে আগের বিল-বন্ডের দায় পরিশোধে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এসেছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, বাকিটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। অর্থাৎ, তিন মাসে বিল-বন্ডের নিলামে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা উঠলেও পুরোনো দেনা শোধের পর সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে এই পরিমাণ।
বাড়ছে সুদহার
সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড বা মুনাফার হার গত ৫ অক্টোবরের নিলামে ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবরের নিলামে তা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অক্টোবরে অন্যান্য মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে। ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড এখন ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
অথচ ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের ঘাটতি নেই। গত আগস্ট শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। তবু সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ায় ইল্ড ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি ঋণের সুদহার বাড়লে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে।
রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়ছে নির্ভরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রথম দুই মাস, জুলাই ও আগস্টেই ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর আওতায় আছেন প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও সামরিক কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার পেনশনভোগী। চলতি বাজেটে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ বরাদ্দ ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে বছরে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়লে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারি অর্থায়নে এখন তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে: নতুন বেতনকাঠামোর ব্যয়, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এবং আগের ঋণ পরিশোধের দায়। ১৪ দিনের বিশেষ ট্রেজারি বিল সেই চাপ সামাল দেওয়ার একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ।