নিজস্ব প্রতিবেদক || ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খায়রুল ইসলামকে প্রত্যাহার ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে ১১ দলীয় জোট।
সেই সঙ্গে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভোট গ্রহণ থেকে শুরু করে গণনা ও ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে জোটটি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে এর আগে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে আজ আবার কমিশনের কাছে অভিযোগ ও দাবিগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সদর উপজেলার ইউএনও খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণসহ নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। তাকে নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হলেও ইউএনওর পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি। এতে তার প্রশাসনিক প্রভাব থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নির্বাচনের আগে তাকে প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে বহাল থাকলে স্থানীয় ভোটার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মীদের ওপর তার প্রভাব থাকতে পারে। শুধু নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে বিরত রাখলে সেই প্রভাব দূর হবে না। তাই নির্বাচনের পরিবেশ নিরপেক্ষ রাখতে তাকে ইউএনওর পদ থেকে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
নির্বাচনি প্রচারে বাধা, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগও কমিশনকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথায়, কখন এবং কারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তার বিবরণ, হামলাকারীদের নাম ও আহত ব্যক্তিদের তথ্যসহ লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে, এসব ঘটনায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে পারিনি।
নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব ভোটারের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। শুধু আশ্বাস দিলে হবে না, মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
১১ দলীয় জোটের দাবিগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য থাকার কথা কমিশন জানিয়েছে। তবে, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কারণে এসব বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনের সময় ইউনিয়নভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে সিভিল সার্জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। এসব ঘটনায় যথাযথ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নোটিশ দেওয়া বা কাগজে-কলমে পদক্ষেপ নেওয়া যথেষ্ট নয়; নির্বাচনি পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে।
ভোট গ্রহণ, গণনা ও ফলাফল প্রকাশের প্রতিটি ধাপে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করেছে বলে জানিয়েছে। এ উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান। তবে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কমিশন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা সুন্দর পরিবেশে হয়েছে এবং কমিশন আশ্বাসও দিয়েছে। তবে মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সেই আশ্বাসের মিল থাকতে হবে। আগামীকালের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ, গণনা ও ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে কমিশন কী ভূমিকা পালন করে, সেটিই হবে প্রকৃত পরীক্ষা। আশ্বাসের প্রতিফলন না ঘটলে কমিশনের বক্তব্যকে লোকদেখানো বলে মনে করবেন তারা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কমিশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, আগে দেওয়া রোডম্যাপ পরিবর্তন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখা নিয়ে তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন। সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়েও জানতে চেয়েছেন। কমিশন জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা নির্বাচন করার জন্যই প্রার্থী দিয়েছেন। তবে ভোটের দিন পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে যায়, তা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন সুষ্ঠু না হলে এর প্রভাব রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ১১ দলীয় জোট আন্দোলনের মাঠে রয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর লং মার্চসহ তাদের কর্মসূচি রয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আরও কঠোর আন্দোলনের দিকে না যায়, সে জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব প্রবাজুল হোসেন মিয়াজী, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ইঞ্জিনিয়ার শহিদুল আলম এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা মুফতি ফখরুল ইসলামসহ ১১ দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।