শরীয়তপুর প্রতিনিধি || শরীয়তপুরের ডামুড্যার খোকন দাস ছিলেন স্থানীয়দের কাছে গরিবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। প্রথমে টাকা লুট, ছুরিকাঘাত ও পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। তিনদিন পর শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান তিনি।
খোকন দাসের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।
হামলার ঘটনার তিনদিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তারা জানায়, ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দিয়েছে অভিযুক্তরা। দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে ছুরিকাঘাতের শিকার হন খোকন। এসময় চিনে ফেললে হামলাকারীরা তার শরীর ও মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ডাক-চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। পরে খোকনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৭), সামছুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা (২১) ও শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদারের (২৫) বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। শনিবার সকালে খোকন দাস মারা যান।
নিহতের প্রতিবেশী সালাহউদ্দিন সরদার বলেন, “খোকন কখনো হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ করতেন না। আমাদের অনুষ্ঠানে তিনি যেতেন, তাদের অনুষ্ঠানেও আমরা আসতাম। তিনি আমাদের সব সময় পাশে ছিলেন। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এটা আমরা মেনে নিতে পারছি না। অপরাধীরা যেই হোক না কেন তাদের আমরা কঠিন বিচার দাবি করছি।”
খোকন দাসের বোন কল্পনা রানী দাস আহাজারি করে বলেন, “আমার ভাই অনেক নিরীহ মানুষ ছিল। ধনী-গরিব সবার চিকিৎসা করতো। কখনো কারো ক্ষতি করেনি। আমার ভাইকে মেরে ফেলা হলো। দরকার পড়লে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিত। আমার ভাইয়ের পেটে-বুকে ও মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, পরে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আজ আমার ভাই আমাদের মাঝে নেই। যারা তাকে হত্যা করেছে তাদের আমরা ফাঁসি চাই।”
খোকন দাসের বাবা পরেশ দাস আক্ষেপ করে বলেন, “হামলার তিনদিন হয়ে গেলো আমি থানায় মামলা করেছি। আজ (শনিবার) আমার ছেলেটাই মারা গেলো। পুলিশ এখন পর্যন্ত অপরাধীদের ধরতে পারছে না। আমরা চাই, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। আমি আমার সন্তানের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।”
খোকন চন্দ্র দাসের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার বিকেলে জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে একটি সংগঠন। পরে বিক্ষোভ মিছিল হয়।
মানববন্ধনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব হেমন্ত কুমার দাস বলেন, পুলিশ এখন পর্যন্ত খোকন দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমরা প্রশাসনকে বলতে চাই, আপনারা অপরাধীদের ধরে প্রমাণ করুন বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ।”
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট অমিত ঘটক চৌধুরী বলেন, “খোকন চন্দ্র দাসের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এটি শুধু একজন ব্যবসায়ীর ওপর হামলা নয়, মানবতার ওপর আঘাত। আমরা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
ডামুড্যা থানার ওসি রবিউল হক বলেন, “খোকন দাস মৃত্যুর আগে যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের নাম বলে গেছেন। তাদের নামে ইতোমধ্যে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই আসামিরা গা ঢাকা দিয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যেকোন উপায়ে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”