1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : Golam Saroar : Golam Saroar
বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে ব্রিকসের সামরিক মহড়ায় ভারত কেন নেই? - দৈনিক প্রথম ডাক
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন

বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে ব্রিকসের সামরিক মহড়ায় ভারত কেন নেই?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২ বার দেখা হয়েছে
দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকসের সামরিক মহড়ায় রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে চীন, রাশিয়া ও ইরানসহ ব্রিকস জোটের কয়েকটি সদস্য দেশের অংশগ্রহণে যৌথ নৌমহড়া শুরু হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বলছে, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সমুদ্রকেন্দ্রিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘উইল ফর পিস ২০২৬’ নামে সপ্তাহব্যাপী এই মহড়া শনিবার (১০ জানুয়ারি) শুরু হয়। যেখানে ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনস্থল, সেই সাইমন্স টাউনে চীনের নেতৃত্বে মহড়াটি হচ্ছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে উদ্ধার অভিযান, সামুদ্রিক হামলা-সংক্রান্ত অনুশীলন এবং কারিগরি অভিজ্ঞতা বিনিময় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই মহড়া এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ব্রিকস জোটকে একটি অর্থনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখে।

ব্রিকস নামটি এসেছে এর প্রতিষ্ঠাতা পাঁচ দেশের নামের প্রথম অক্ষর থেকে- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে। তবে ভারত ও ব্রাজিল এই মহড়ায় অংশ নেয়নি।

তাহলে এই মহড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? এর লক্ষ্য কী? আর কেন কিছু প্রতিষ্ঠাতা দেশ অংশ নিচ্ছে না?

কারা মহড়ায় অংশ নিচ্ছে?
চীন ও ইরান ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট জাহাজ। দক্ষিণ আফ্রিকা মোতায়েন করেছে একটি মাঝারি আকারের ফ্রিগেট।

‌১০ জানুয়ারি কেপটাউনের দক্ষিণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনা কর্মকর্তারা জানান, ব্রাজিল, মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়া পর্যবেক্ষক হিসেবে মহড়ায় যুক্ত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ টাস্কফোর্সের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ননদাখুলু থমাস থামাহা বলেন, “এটি শুধু সামরিক মহড়া নয়, বরং ব্রিকস দেশগুলোর অভিপ্রায়ের একটি স্পষ্ট বার্তা।”

দক্ষিণ আফ্রিকা এটিকে ‘ব্রিকস প্লাস’ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার লক্ষ্য ‘নৌ চলাচল ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। ব্রিকস প্লাস কাঠামোর মাধ্যমে মূল সদস্যদের বাইরেও অন্যান্য দেশকে যুক্ত করা যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা জানান, জোটের সব সদস্যকেই মহড়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসে যোগ দেয়। একই সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও জোটে যুক্ত হয়।

কেন এই মহড়া গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ আফ্রিকা আগেও চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌমহড়া করেছে।

থমাহা বলেন, “এটি একসঙ্গে কাজ করার আমাদের যৌথ অঙ্গীকারের প্রকাশ। বর্তমান জটিল সামুদ্রিক পরিবেশে এমন সহযোগিতা বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।”

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, এই মহড়া সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সুরক্ষা, যৌথ আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শান্তিপূর্ণ সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে অংশগ্রহণকারী নৌবাহিনীগুলোর অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

এই মহড়া এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তিন দিন আগে উত্তর আটলান্টিকে ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট একটি রুশ তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করা হয়। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করার ও দেশটির বিপুল তেলসম্পদ কাজে লাগানোর ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প প্রশাসন কিউবা, কলম্বিয়া, ইরান এমনকি ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধেও সামরিক হুমকি দিয়েছে।

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ব্রিকস
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ব্রিকসের কিছু সদস্য দেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ নীতি অনুসরণ করছে।

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যখন উত্তপ্ত, তখন ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং ভারতের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছেন। ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থ জোগাচ্ছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প সব ব্রিকস সদস্য দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।

তিনি বলেন, “ব্রিকস নামের এই গোষ্ঠীর কথা শুনে আমি তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি। তারা যদি সত্যিই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে সেটা বেশি দিন টিকবে না।”

জুলাইয়ের যৌথ ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা একতরফা শুল্ক আরোপের সমালোচনা করেন এবং ইরানে সামরিক হামলার নিন্দা জানান, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি বলা হয়নি।

কারা মহড়ায় অংশ নেয়নি এবং কেন?
ব্রিকসের দুই প্রতিষ্ঠাতা দেশ- ভারত ও ব্রাজিল এই নৌমহড়ায় অংশ নেয়নি।

ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হলেও ভারত পুরোপুরি দূরে থেকেছে।

ট্রাম্প ফের ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। রুশ তেল কেনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের টানাপোড়েন চলছে। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমনকি তা ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিলও অনুমোদনের খবর রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ভারত নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সৌর জোট থেকেও সরে গেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক হর্ষ পান্ত বলেন, ভারতের অনুপস্থিতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দেওয়ার কৌশল। তিনি বলেন, “এই ধরনের সামরিক মহড়া ব্রিকসের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”

ব্রিকস মূলত একটি অর্থনৈতিক ও উন্নয়নভিত্তিক জোট, সামরিক জোট নয়।

পান্ত বলেন, “চীন, রাশিয়া, ইরান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য কিছুটা- এই মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান দেখানোর একটি উপায়।”

তিনি আরো বলেন, “ভারত চায় না ব্রিকসকে সামরিক জোট হিসেবে দেখা হোক।” পাশাপাশি ব্রিকস প্লাস দেশগুলোর মধ্যেও ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইরান-মিশরের মতো গভীর মতপার্থক্য রয়েছে, যা একটি শক্ত সামরিক জোট গঠনের পথে বড় বাধা।

সর্বশেষ কবে দক্ষিণ আফ্রিকা যৌথ নৌমহড়া আয়োজন করেছিল?
দক্ষিণ আফ্রিকা এর আগে ‘এক্সারসাইজ মোসি’ নামে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে দুইবার যৌথ নৌমহড়া করেছে।

প্রথম মোসি মহড়া হয় ২০১৯ সালের নভেম্বরে। দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ইউক্রেন আক্রমণের এক বছর পূর্তির সময়।

তখন পশ্চিমা দেশগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার সমালোচনা করেছিল।

২০২৫ সালের শেষ দিকে তৃতীয় মহড়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা জি-২০ সম্মেলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় পিছিয়ে যায়। সেই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি।

বর্তমানে চলমান ‘উইল ফর পিস ২০২৬’ আসলে সেই তৃতীয় মহড়ারই নতুন নাম।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য কী ঝুঁকি রয়েছে?
দক্ষিণ আফ্রিকার জলসীমায় এই যৌথ নৌমহড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা আরো বাড়াতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর নানা ইস্যুতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।

এই টানাপোড়েনের একটি বড় কারণ হলো, দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনে প্রিটোরিয়া। প্রাথমিক রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত বলেছে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা রয়েছে।

সম্পর্ক উন্নত করার আশায় মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা হোয়াইট হাউস সফর করলে ট্রাম্প মিথ্যাভাবে দাবি করেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে।

রামাফোসা এই দাবি নাকচ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো রাজনৈতিক দলই ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির মতো দেশে ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’ ঘটছে বলে মনে করে না।

বিশ্বজুড়ে যখন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, ঠিক তখনই এই সামরিক মহড়া আয়োজন করায় ঝুঁকি বাড়ছে; কারণ যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দেশকে সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবে দেখে।

এ ছাড়া রামাফোসার সরকার দেশের ভেতরেও চাপের মুখে রয়েছে। তার সরকারের অন্যতম বড় জোটসঙ্গী, উদারপন্থি ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) এই মহড়ার সমালোচনা করেছে।

দলটির মুখপাত্র ক্রিস হ্যাটিংহ এক বিবৃতিতে বলেন, ব্রিকসের কোনো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো বা যৌথ সামরিক পরিকল্পনা নেই, যে কারণে এমন সামরিক মহড়া যৌক্তিক নয়।

ডিএ আরো বলেছে, ব্রিকস দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু বেপরোয়া রাষ্ট্রের ক্ষমতার খেলায় একটি দাবার ঘুঁটিতে পরিণত করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ

Categories

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed By: SISA IT