পটুয়াখালী (উপকূল) প্রতিনিধি || উপকূলের রাখাইন শিশুদের মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা টিকিয়ে রাখতে দুই দশকেরও বেশি সময় নীরবে কাজ করছেন এক বৌদ্ধ মহাথেরো। স্থানীয় শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ১০ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে আবাসিকে রেখে তিনি তাদের সুশিক্ষায় গড়ে তুলছেন। ষাটোর্ধ্ব এ মহাথেরোর নাম উত্তম। তিনি পটুয়াখালী সদরের মিশ্রিপাড়া গ্রামের সীমা বৌদ্ধ বিহারের প্রবীণ ভিক্ষু।
২০০৭ সালে বিহারে যোগদানের পরই উত্তম উপলব্ধি করেন, পাঠ্যবইয়ে রাখাইন মাতৃভাষা ও বৌদ্ধ ধর্মশিক্ষার অভাবে নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ছে। সেই ভাবনা থেকে তিনি নিজ উদ্যোগে শুরু করেন বিনামূল্যে মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষার কার্যক্রম। এখন মিশ্রিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিশুদের নিয়মিত পাঠদান করেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনযোগী করতে উপহার দেন বই, খাতা, কলম ও ছাতা।
শুধু তাই নয়, উত্তরাঞ্চল থেকে আসা আরও ১০ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে আবাসিকে রেখে ধর্মীয় শিক্ষা, বিদ্যালয়ের লেখাপড়া এবং ভরণপোষণের দায়িত্বও বহন করছেন তিনি। তবে বিহারের আয় থেকে সামান্য কিছু অর্থ যোগান পেলেও সীমিত সামর্থ্যে এ উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার দাবি জানান এই মহাথেরো। তার এমন মানবিক উদ্যোগে বিনামূল্যে সুশিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। ফলে স্থানীয়রাও পাঠশালাটি চালু রাখতে সরকারী সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
মিশ্রিপাড়া গ্রামের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী এমা রাখাইন বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষা এবং মাতৃভাষা শিক্ষার কোনো বই নেই। তাই আমরা প্রতিদিন বিকালে মহাথেরোর কাছে ধর্ম শিক্ষা এবং রাখাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে আসি। তিনি আমাদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করেন। অনেক সময় খাতা, কলম, বই ও ছাতি উপহার দেন।
খাগড়াছড়ি এলাকার আরেক শিক্ষার্থী মং থুন বলেন, আমরা সীমা বৌদ্ধ বিহারে আবাসিক থেকে মিশ্রিপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছি। আর বিহারে ধর্ম শিক্ষা ও ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করি। আমাদের পড়ালেখার সকল খরচ তিনি বহন করে। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

মিশ্রিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মংলাচিন বলেন, আমাদের বিহারে মাহাথেরো ভাষা শিক্ষা ও ধর্ম শিক্ষার জন্য নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে লেখাপড়া করাচ্ছেন। তার এই উদ্যোগ যুগে যুগে স্মৃতি হয়ে থাকবে। তবে এ পাঠশালাটি যেন বন্ধ হয়ে না যায় এজন্য আমরা সরকারি সহায়তার দাবি জানাচ্ছি।
উত্তম মহাথেরো বলেন, আগে আমাদের প্রতিটা পাড়া-মহল্লায় ভাষা শিক্ষা ও ধর্ম শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষক ছিলো। এখন আর নেই। তাই আমি এ বিহারে যোগদানের পরেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ভাষা শিক্ষা ও ধর্ম শিক্ষা প্রদান করে আসছি। বিহারে যে পর্যটকরা প্রবেশ ফি দেয় সে টাকা থেকে কিছু অংশ আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু ওই টাকায় এখন আর এ পাঠশালটি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমি চাচ্ছি এ পাঠশালাটি আরো বড় করতে এবং এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে। সরকার যদি সহযোগিতা করে তাহলে পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, উত্তম মহাথেরো দীর্ঘদিন ধরে যে কাজটি করছেন এটা আসলেই ভালো এবং মানবিক উদ্যোগ। আমরা উত্তম মহাথেরোকে সকল ধরনের সহযোগিতা করব।