বান্দরবান প্রতিনিধি || বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেয়াল ও ছাদে অসংখ্য ফাটল, বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়া, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার কারণে আতঙ্কে রয়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীরা। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হিসেবে নির্মাণ করা হয় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবন। দীর্ঘ ৩৯ বছরেও ভবনটির বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। বর্ষা মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় রোগী ও চিকিৎসকদের।
শুধু ভবনের অবস্থাই নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে রয়েছে চরম জনবল সংকট। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্টাফসহ প্রয়োজনীয় জনবল থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। ২৫ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। তিনটি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে আছেন একজন। ১৮ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন। এ ছাড়া, দুটি ফার্মাসিস্ট পদের বিপরীতে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। চারজন জুনিয়র কনসালটেন্টের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন একজন। ডেন্টাল সার্জন ও নার্সিং সুপারভাইজারের পদও রয়েছে শূন্য। অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্সের পদও শূন্য রয়েছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে ছুটতে হচ্ছে রোগীদের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। নার্স সংকটের কারণে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডেও ব্যাহত হচ্ছে সেবাদান কার্যক্রম। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ।
রোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সময়মতো ছোটখাটো ত্রুটি মেরামত না করায় এখন সেগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পলেস্তারা খসে হাসপাতাল ভবনের সানশেডের রড বের হয়ে গেছে
একদিকে ভবন ধসে পড়ার আতঙ্ক, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স সংকট সব মিলিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। দুর্গম এলাকা থেকে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে চিকিৎসার জন্য এসে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেক রোগী হতাশ হয়ে ফিরছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কুলসুম আক্তার বলেন, “ভবনের বিভিন্ন জায়গা থেকে দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কখন কোন অংশ ধসে পড়ে, সেই আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক ও নার্স সংকট এবং হাসপাতালের চারপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।”
মো. সালমান নামের স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “দূর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটিকে দেখতে অনেকটাই পরিত্যক্ত ভবনের মতো মনে হয়। দেয়ালের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও ছাদের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। চারপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান বলেন, “দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভবনটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, “স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বর্তমান ভবনটির অবস্থা পরিদর্শন করে নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”