নিজস্ব প্রতিবেদক || কৃত্রিমভাবে জিপিএ বা নম্বর বাড়ানোর পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এবার সব শিক্ষা বোর্ডে একক প্রশ্নপত্র ব্যবহার এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, তার প্রকৃত সক্ষমতার ভিত্তিতেই এবার ফলাফল এসেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সকাল সোয়া ১০টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ করেন।
একক প্রশ্নপত্র, সিসিটিভি-বডি ক্যামেরায় নজরদারি
মাহদী আমিন বলেন, এবার প্রথমবারের মতো সব শিক্ষা বোর্ডে একক প্রশ্নপত্র নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি বডি ক্যামেরাও ব্যবহার করা হয়েছে। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শতভাগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়েছে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে কৃত্রিমভাবে জিপিএ বা নম্বর বাড়ানোর যে সংস্কৃতি ছিল, সেখান থেকে সরকার পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে চায়। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চান, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা অর্জন করে বেরিয়ে আসবে।
ফলে যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, তার প্রকৃত সক্ষমতার ভিত্তিতেই এবার ফলাফল এসেছে, বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন
ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, তাদের পরিবার যেমন গর্বিত, সরকারও তাদের নিয়ে গর্বিত। তবে যারা প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারেনি, তাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ভালো বা খারাপ ফলাফল জীবনের সবকিছু নয়। সরকার তাদেরও পাশে থাকবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানান। কোনো অবস্থাতেই থেমে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার সব শিক্ষার্থীর পাশে রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ
এবারের এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছে কি না এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখান থেকে আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো হবে।
ভালো প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি, দুর্বলতা চিহ্নিতের আহ্বান
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষার্থীদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে হবে। যারা ভালো ফলাফল করেছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো করেছে, তাদের স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
একইসঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানে ঘাটতি রয়েছে, সেসব সমস্যা চিহ্নিত করে সরকার, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
কারিকুলামে পরিবর্তন, যুক্ত হচ্ছে চার নতুন বই
শিক্ষাব্যবস্থায় চলমান সংস্কার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বিগত ১৬ বছরে রাষ্ট্র কাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম। এ অবস্থার পরিবর্তনে একাডেমিক কারিকুলামে সংযোজন, বিয়োজন ও সংস্কারের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষেই সব পরিবর্তন একসঙ্গে করা সম্ভব হবে না। তবে নতুন করে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চারটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।
২২ লাখ শিক্ষার্থী নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, দেশের তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষা কার্যক্রমে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সমন্বয় এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান মাহদী আমিন। শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এসব কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
১৬ বছরের পরিবর্তন পাঁচ-ছয় মাসে সম্ভব নয়
মাহদী আমিন বলেন, গত ১৬ বছরের একটি রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন পাঁচ-ছয় মাসে সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। বহুপাক্ষিক আলোচনা, সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে প্রত্যাশিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা হবে।
গণমাধ্যমকে সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভালো উদ্যোগগুলোও গণমাধ্যমে তুলে ধরার অনুরোধ করেন।