গাজীপুর প্রতিনিধি || একসময় সকাল হলেই তুরাগের বুক চিরে নৌকা ভিড়ত বড়ইবাড়ী হাটের তীরে। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ আসতেন কেউ নিত্যপণ্য কিনতে, কেউবা ধান-চাল, মাছ, গবাদিপশু কিংবা কৃষিপণ্য নিয়ে আসতেন বিক্রির জন্য। মঙ্গলবার এলেই জমে উঠত পুরো এলাকা। বেচাকেনার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠত তুরাগপাড়ের প্রায় ১০০ বিঘা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত হাটটি।
সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলে গেছে।
এখনো মঙ্গলবার হাট বসে, দোকান খোলে, ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন। কিন্তু হাটের প্রাণচাঞ্চল্যে যেন ভাটা পড়েছে। কোথাও জমে থাকা পানি, কোথাও হাঁটুসম কাদা। একটু বৃষ্টি হলেই চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। আর ভারী ট্রাক্টর চলাচলে কাদার স্তর আরো নরম ও গভীর হয়ে যায়। ফলে অনেক ব্যবসায়ীরা আগের মতো হাটে বসতেই চান না।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চাইপাইর ইউনিয়নের তুরাগ নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বড়ইবাড়ী হাটের এমন চিত্রই দেখা গেছে সরেজমিনে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই আশপাশের অন্তত ৫০ গ্রামের মানুষের কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এ হাট। মঙ্গলবারের সাপ্তাহিক হাটে বিপুল মানুষের সমাগম হতো। কোটি টাকার বেশি লেনদেনের কথাও জানান সংশ্লিষ্টরা। ধান, চাল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, হাঁস-মুরগি, দুধ, ফলমূল, গাছপালা থেকে শুরু করে তৈজসপত্র ও মনিহারি সামগ্রী-কী ছিল না এই হাটে!
কিন্তু অবকাঠামোগত সংকট আর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সেই ব্যস্ত হাট এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
হাট ঘুরে দেখা যায়, চারপাশে শতাধিক দোকান, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক থাকলেও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নাজুক। বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কার্যকর কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে কাদা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারী যানবাহনের চলাচল পরিস্থিতিকে আরো দুর্বিষহ করে তুলছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নজরুল সিকদারের চোখে বড়ইবাড়ী হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি তাঁর শৈশবের স্মৃতিও।
তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই হাটের ব্যস্ততা দেখে বড় হয়েছেন। একসময় নৌপথ ও স্থলপথে হাজারো মানুষ এখানে আসতেন। এখন হাটের পরিবেশ দেখে মানুষের আসতে ইচ্ছে করে না। ব্যবসাও আগের মতো নেই।” দ্রুত হাটটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান তিনি।
কাঁচামাল বিক্রেতা আবুল কাশেমের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি জানান, একসময় এই হাট ছিল এলাকার মানুষের ভরসার জায়গা। এখন হাটে এসে আগের সেই পরিবেশ খুঁজে পান না। তার মতে, বড়ইবাড়ী হাটের সঙ্গে এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও পুরোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন, জুয়েল মিয়া ও কাদের হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হাটটির প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। পরে ভারী ট্রাক্টর চলাচল করলে কাদা এতটাই বেড়ে যায় যে দোকানে বসে ব্যবসা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে হাট ইজারাদার জহির মিয়ার দাবি, সমস্যার বিষয়টি তিনি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছেন। হাটের একটি সেড ভেঙে যাওয়ায় সেটি মেরামতের জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য হাটের চেহারা বদলে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, হাটের সেড মেরামতের আবেদনের চেয়ে বর্তমানে হাটের পরিবেশ উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে হাটের চারপাশে বড় ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এরপর হাটের নিচু অংশে মাটি ফেলে সমতল করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাসে নয়—বাস্তব কাজের মধ্য দিয়েই ফিরবে বড়ইবাড়ী হাটের পুরোনো প্রাণ। কারণ তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাটটি কেবল একটি সাপ্তাহিক বাজার নয়; ছয় দশক ধরে এটি আশপাশের মানুষের বেচাকেনা, জীবিকা ও স্মৃতির এক জীবন্ত ঠিকানা। তাই কাদা-পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার আগে ঐতিহ্যবাহী হাটটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন চান স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।