গাজীপুর প্রতিনিধি || একসময় যেখানে শত শত মানুষ গোসল করতেন, সাঁতার কাটতেন- সেই ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজদিঘি এখন যেন সবুজ চাদরে ঢাকা এক জলাশয়। দিঘির অধিকাংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কচুরিপানা। কোথাও কোথাও জমেছে ময়লা-আবর্জনা ও নিষিদ্ধ পলিথিন। অবহেলা আর অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে ইতিহাসের সাক্ষী এই জলাধারটি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব।
গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পুরোনো ইতিহাস। এই রাজবাড়িকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। ১৯৭৫ সালে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া চৌধুরী অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ এবং ২০১৮ সালে যিশু সেনগুপ্ত ও জয়া আহসান অভিনীত ‘এক যে ছিল রাজা’ সিনেমার কাহিনির সঙ্গে ভাওয়াল রাজ পরিবারের বাস্তব ইতিহাসের যোগসূত্র রয়েছে।
রাজবাড়ির সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাওয়াল রাজদিঘি। ১৮৩৫ সালে সন্ন্যাসী রাজা রামেন্দ্র নারায়ণের পিতামহ জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী দিঘিটি খনন করেন। ভাওয়াল রাজার আমলে এটি ‘ঢোলসমুদ্র’ নামেও পরিচিত ছিল বলে জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজদিঘির চারপাশে রয়েছে অযত্নের চিহ্ন। দিঘির প্রায় পুরো জলভাগ কচুরিপানায় ঢাকা। পশ্চিম ও উত্তর পাশের কয়েকটি স্থানে ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। দীর্ঘদিন ধরে এসব আবর্জনা জমে থাকায় পানির স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
দূর থেকে তাকালে দিঘিটিকে অনেকটা সবুজ মাঠের মতো মনে হয়। কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে কোথায় পানি আর কোথায় উদ্ভিদের বিস্তার তা বোঝার উপায় নেই। অথচ একসময় এই জলাধার ছিল স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
গাজীপুর মহানগরীর বাসিন্দা বুরহানউদ্দিন অরণ্য বলেন, ভাওয়াল রাজদিঘির সঙ্গে শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা শেষে শান বাঁধানো ঘাটে ঝাঁপ দেওয়া, সাঁতার কাটা-সবই ছিল নিয়মিত। তখন দিঘির পানি ছিল অনেক স্বচ্ছ। এখন অযত্ন-অবহেলায় সেই রাজদিঘি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
অপর বাসিন্দা মো. কাজল মিয়া বলেন, দিঘির উত্তর পাশে বিভিন্ন জায়গায় পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। পুরো দিঘি কচুরিপানায় ভরে গেছে। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই সেখানে পানি আছে নাকি সবুজ কোনো মাঠ। দিঘিটি পরিষ্কার ও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হলে এটি পর্যটক ও নগরবাসীর আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ভাওয়াল রাজার সময়ের ঐতিহাসিক ঢোলসমুদ্র হিসেবে পরিচিত রাজদিঘি সংস্কার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। একটি ঐতিহাসিক জলাধারের এমন পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগের।
তিনি বলেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে। পরিকল্পিতভাবে দিঘির কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণের পাশাপাশি পানির গুণগত মান ফিরিয়ে আনতে হবে।
মো. মনির হোসেন বলেন, দিঘির চারপাশে কাঠের ওয়াকওয়ে, বসার জায়গা, সবুজায়ন এবং জীববৈচিত্রবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে এটি একটি নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে পরিষ্কার জলাধারটি মাছ, জলজ প্রাণী, পাখি ও বিভিন্ন উদ্ভিদ-প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
রাজদিঘি নিয়ে আশার কথাও জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে ইতোমধ্যে রাজদিঘির সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, দিঘিটিকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে রাজদিঘি গাজীপুর শহরের অন্যতম সুন্দর স্থানে পরিণত হবে।”