কুবি প্রতিনিধি || বন্ধুত্ব থেকে বিশ্বাস, বিশ্বাস থেকে ভালোবাসা—এরপর সেই ভালোবাসার গন্তব্য বিয়ে। যে ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছিল পরিচয়, সেই ক্যাম্পাসের করিডোর, লাল মাটি আর সবুজের ছায়াকে সাক্ষী রেখেই জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) অর্থনীতি বিভাগের দুই শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান ও মাকসুদা আক্তার সাথী। বিয়ের আগের দিন প্রিয় সহপাঠীদের আয়োজনে নিজেদের ক্যাম্পাসেই হয়ে গেল তাদের গায়ে হলুদ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসান ও সাথীর সম্পর্কের শুরু বন্ধুত্ব দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব গড়ায় ভালোবাসায়। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর পারিবারিক সম্মতিতে এবার তারা বসতে যাচ্ছেন বিয়ের পিঁড়িতে। আর তার আগের দিন বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) তাদের এই নতুন যাত্রার আনন্দে মেতে ওঠে পুরো ব্যাচ।
হলুদের রঙে রঙিন প্রিয় প্রাঙ্গণ
সেদিন কুবি প্রাঙ্গণটা যেন আর দশটা দিনের মতো ছিল না। হলুদ শাড়ি আর গয়নায় সেজে কনে সাথী যখন বন্ধুদের মাঝে বসেন, ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে নেন বান্ধবীরা। অন্যদিকে বর হাসানকে ঘিরে বন্ধুদের উচ্ছ্বাস। গায়ে হলুদ মাখানো থেকে শুরু করে কেক, মিষ্টি ও ফল খাওয়ানো—সবকিছুতেই ছিল আপনজনের মতো বন্ধুত্বের ছোঁয়া।
কারো কণ্ঠে গান, কারো পায়ে নাচ। কখনো হাসি-ঠাট্টা, কখনো ক্যামেরার ফ্রেমে মুহূর্ত ধরে রাখার ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত আঙিনাই সেদিন হয়ে উঠেছিল ছোট্ট এক উৎসবের জায়গা। ইট-কাঠের ভবন, চেনা করিডোর আর সবুজ ক্যাম্পাস নীরবে সাক্ষী হয়ে থাকল দুই সহপাঠীর এক হয়ে যাওয়ার গল্পের।
বন্ধুদের আয়োজনে বন্ধুত্বের উদযাপন
হাসান ও সাথী দুজনই সহপাঠীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই বিয়ের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি শুধু পারিবারিক গণ্ডিতে না রেখে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেই ক্যাম্পাসে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
বর-কনের সহপাঠী তাসমিয়া মারজান বলেন, “আমাদের অর্থনীতি ১৬ ব্যাচের দুই প্রিয় ব্যাচমেট হাসান এবং সাথীর জীবনের নতুন অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা ক্যাম্পাসেই এই হলুদ আয়োজনের উদ্যোগ নিই। পুরো ব্যাচের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি আমাদের কাছে শুধু একটি হলুদ অনুষ্ঠান ছিল না, বরং আমাদের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক বন্ধনের একটি সুন্দর উদযাপন ছিল। কুবি ক্যাম্পাসে এমন ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেলেও এই দিনটি আমাদের সবার স্মৃতিতে বিশেষ হয়ে থাকবে।”

বন্ধুত্বের ক্যাম্পাসেই ভালোবাসার হাসান-সাথীর নতুন অধ্যায়ের উদযাপন
আরেক সহপাঠী মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, “এই অনুষ্ঠানটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা অসাধারণ স্মৃতি হয়ে থাকবে। দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শেষে কর্মজীবনের ব্যস্ততার কারণে বন্ধুবান্ধবসহ বিয়ের মতো অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। আমার দুই বন্ধু চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ব্যাচমেট হিসেবে এটা আমাদের অনেক আনন্দিত করছে।”
যে ক্যাম্পাসে শুরু, সেখানেই নতুন শুরুর উদযাপন
হাসানের কাছে এই আয়োজনের অনুভূতিটাও যেন একটু আলাদা। কারণ তাঁদের গল্পের প্রথম অধ্যায় লেখা হয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই। সেই পরিচিতির জায়গাটিকেই জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনাতেও পাশে পেয়েছেন তারা।
ক্যাম্পাসে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান নিয়ে বর মোহাম্মদ হাসান নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, “ক্যাম্পাস জীবনের শুরু থেকেই আমাদের পরিচয়। শুরুটা হয়েছিল বন্ধুত্ব দিয়ে। হয়তো ভালোবাসার সেই সফরটাই সবচেয়ে সুন্দর, যেখানে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং বিয়ে সবকিছুই একজনের সাথেই হয়। আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি এমন একজন জীবনসঙ্গিনী পেয়ে।”
হাসান আরো বলেন, “আমাদের এই যাত্রায় সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে। তাই আমি চেয়েছি, আমাদের এই শুভ সূচনাটি আমার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়েই উদযাপন করতে। মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা তিনি যেন আমাদের নতুন সংসারকে তার রহমত, বরকত ও শান্তিতে পূর্ণ করেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন একসময় শেষ হয়ে যাবে, বদলে যাবে চেনা করিডোরের ব্যস্ততা, থেমে যাবে একসঙ্গে আড্ডা দেওয়ার নিয়মিত দিনগুলো। কিন্তু বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসায় পৌঁছানোর এই গল্পের একটি দিন থেকে যাবে কুবির স্মৃতিতে—হলুদের রঙে, বন্ধুদের হাসিতে আর প্রিয় ক্যাম্পাসের লাল মাটিতে।