নিজস্ব প্রতিবেদক || দেশের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাতকে চাঙা করতে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। একই সঙ্গে নতুন কারখানা স্থাপন, পুরোনো কারখানার আধুনিকায়ন, কোল্ড স্টোরেজ, যন্ত্রপাতি কেনা এবং চলতি মূলধনের জন্যও অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
রবিবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত বিআরপিডি-১ সার্কুলার নং–১৬ জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত এ তহবিল তিন বছর মেয়াদে রিভলভিং ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংক অংশগ্রহণ চুক্তি সাপেক্ষে এ স্কিমে যুক্ত হতে পারবে।
কেন নতুন তহবিল
সার্কুলারে বলা হয়েছে, রপ্তানিমুখী হিমায়িত খাদ্য শিল্প, বিশেষ করে চিংড়ি, মাছ ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্য খাতে দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে থাকা, পণ্য মজুতের ব্যয়, কোল্ড-চেইন পরিচালনার উচ্চ খরচ এবং কম সুদে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেই নতুন প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করা হয়েছে।
নতুন কারখানায় ৩০ কোটি, আধুনিকায়নে ২০ কোটি
নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ পাবেন। ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ সাত বছর, যার মধ্যে এক বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তবে, প্রকল্পে উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ রাখতে হবে এবং ঋণ ও নিজস্ব মূলধনের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭০:৩০ হবে।
বিদ্যমান কারখানার সংস্কার, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। এ ঋণের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং এক বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড থাকবে।
চলতি মূলধনেও বিশেষ সুবিধা
কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধনের ঋণ দেওয়া হবে। এ ঋণের মেয়াদ এক বছর হলেও সন্তোষজনক লেনদেন থাকলে একবার নবায়নের সুযোগ থাকবে। ফলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যাবে।
সৌর বিদ্যুতেও বাড়তি ঋণ
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন উৎসাহিত করতে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা অথবা মূল প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ- যেটি কম, সে পরিমাণ অতিরিক্ত ঋণ পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুই বছরের মধ্যে নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যাংক পাবে ৪ শতাংশ, গ্রাহক দেবেন সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ
স্কিমের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ পাবে। আর উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। তবে, ঋণের পুরো ঝুঁকি ও আদায়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপরই থাকবে। নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ফেরত না দিলে বিলম্বিত সময়ের জন্য অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ গুনতে হবে।
কারা অগ্রাধিকার পাবেন
চলতি মূলধনের সংকটে যেসব হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না। একই উদ্দেশ্যে যারা আগে থেকেই রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বা রপ্তানি সহায়ক প্রি-ফাইন্যান্স তহবিল (ইএফপিএফ) থেকে অর্থ নিচ্ছেন, তারা এই স্কিমের আওতায় একই খাতের জন্য নতুন ঋণ নিতে পারবেন না।
অনুমোদন ছাড়া মিলবে না ঋণ
তহবিলের অর্থ পেতে সংশ্লিষ্ট কারখানার মৎস্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্র থাকতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে প্রতি তিন মাসে ঋণ ব্যবহারের অগ্রগতি পরিদর্শন ও তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ বিশেষ প্রি-ফাইন্যান্স স্কিমের মাধ্যমে হিমায়িত খাদ্য শিল্পে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে।