বগুড়া প্রতিনিধি || দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তাকে ঘিরে প্রত্যাশার শেষ নেই সাধারণ মানুষেরও। তাদের বিশ্বাস- তাঁর হাত ধরেই রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তন ঘটবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার, বদলে যাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আর ভাগ্য। এই বিশ্বাস থেকেই তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। তবে বগুড়ায় সেই আনন্দটা যেন আকাশ ছুঁয়েছে।
তারেক রহমানের বাবা বাংলাদেশের সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাই সন্তান হিসেবে তিনিও বেছে নেন রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবন। আর তাই তাকে একের পর এক মামলা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই কোকোর মৃত্যু কিংবা মায়ের অসুস্থতায় পাশে না থাকার বেদনাকে সঙ্গী করেই দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে ভার্চুয়ালি নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বিএনপিকে। হাজার মাইল দূরে থেকেও বেগবান করেন জুলাই আন্দোলনকেও। বারবার দেশে ফেরার আয়োজন করেও নানা জটিলতায় আসতে পারেননি তিনি।
তবে দীর্ঘ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে আগামীকাল ২৫ ডিসেম্বর। আর তাই বগুড়ার নেতাকর্মীরা আরো উজ্জীবিত হয়ে পড়েছেন। তাঁর আগমনকে ঘিরে দফায় দফায় চলছে মিছিল-মিটিং। এরইমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক বাড়ি এবং সেই বাড়িতে প্রবেশের সড়কও।
বগুড়া শহরের যে বাড়িতে থেকে তারেক রহমান বগুড়াসহ উত্তরের জেলাগুলোর নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন- দীর্ঘদিন অবহেলা অযত্নে পড়ে থাকা সেই বাড়িটিও সংস্কার করা হচ্ছে। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে ২৫ ডিসেম্বর বগুড়া থেকে অন্তত অর্ধ লক্ষ নেতাকর্মী ঢাকায় যাবেন বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বগুড়ায় স্বাগত মিছিল করেছে যুবদল জেলা শাখা। গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকালে শহরের মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল মাঠের সামনে থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি সাতমাথা হয়ে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। স্বাগত মিছিলে অংশ নেন জেলা যুবদলের সকল ইউনিটের হাজার হাজার নেতাকর্মী। মিছিলের পূর্বে হাসপাতাল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ। মিছিলে জেমসের ‘লিডার আসছে’ গানটি বাজিয়ে পুরো বগুড়াকে জানান দেওয়া হয় তারেক রহমান আসছেন।
বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকার রিয়াজ কাজী লেনে অবস্থিত তারেক রহমানের অর্থায়নে নির্মিত ‘গ্রীন এস্টেট’ নামের বাড়িটির সংস্কার করা হচ্ছে। তারেক রহমান বগুড়ায় এলে ওই বাড়িতেই তিনি অবস্থান করতেন। তিনি লন্ডন চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থাতেই ছিল। এ বাড়ি থেকেই তারেক রহমান বগুড়া তথা উত্তরের জেলাগুলোর নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। উত্তরের কোনো জায়গায় গিয়ে ফেরার পথে বগুড়ার এ বাড়িতে রাত্রিযাপন করতেন।
সাবেক সংসদ সদস্য লালু তার বাড়ির পাশের পাঁচ শতাংশ জমি তারেক রহমানকে মৌখিকভাবে দেন। পরে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন তারেক রহমান। বিশেষ নিরাপত্তা অনুযায়ী বাড়ির নকশা করা হয়। মূলত এই বাড়িটিকে ঠিকানা হিসাবে নিয়েছিলেন তিনি। ওয়ান ইলেভেনের সময় তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং পরে মুক্ত হয়ে লন্ডন চলে যান। এরপর থেকে বাড়িটিতে কোনো কেয়ার টেকারও ছিল না।
বগুড়া শহরের আব্দুল কাদের নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমাদের দেশের একজন নায়ক তারেক রহমান। তিনি দেশে ফিরছেন এটা শোনার পর খুব ভালো লাগছে। এটা ঈদের দিনের চেয়েও আমাদের কাছে বেশি আনন্দের। তিনি বগুড়া-৬ আসন থেকে ভোট করবেন এজন্য আমরা আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাব।”
বগুড়া শহরের সিএনজি অটো রিকশা চালক হারুনুর রশিদ বলেন, “আমরা চাই তিনি দেশে ফিরে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন।”
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রাসেল মুন্সী বলেন, “তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবর আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। তাঁর হাত ধরেই দেশের উন্নয়ন ঘটবে। জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়ন হবে। ১৭ বছর বাগবাড়ীতে কোন উন্নয়ন হয়নি। তাঁর হাত ধরেই এই এলাকায় উন্নয়ন হবে।”
বগুড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, এই জেলার অধিকাংশ জায়গায় তারেক রহমান তার ছাপ রেখে গেছেন। তার সম্পর্ক বগুড়ার মাটি ও মানুষের সাথে। তাই উচ্ছ্বসিত বগুড়ার সাধারণ মানুষ। তারা অপেক্ষা করছে তারেক রহমানের ফেরার দিনটির।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, “প্রায় দেড় যুগ ধরে বগুড়ার মানুষ অবহেলিত, বঞ্চিত। বগুড়ার যেটুকু দৃশ্যমান উন্নয়ন তা তারেক রহমানের হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কাজেই আমাদের আনন্দ উচ্ছ্বাসটা একটু বেশিই। কারণ তাঁর হাত ধরেই বগুড়ার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে, বগুড়ার মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বগুড়া থেকে অর্ধ লক্ষাধিক নেতাকর্মী ঢাকায় যাবেন।”
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এবং কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু বলেন, “দেশে অনেক দিন পর একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এতে বিএনপি অংশ গ্রহণ করছে। এরইমধ্যে আসনগুলোতে আমাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকে এবং খালেদা জিয়া বগুড়া-৭ আসন থেকে নির্বাচন করার কথা। দলের পক্ষ থেকে এটা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন। তারেক রহমান যেহেতু বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচন করবেন- আমরা আশা করছি, তিনি ২৮ তারিখে বগুড়ায় এসে মনোনয়ন দাখিল করবেন। সেই জন্য তার অর্থায়নে নির্মিত বগুড়া শহরে যে বাড়িটি রয়েছে, যেখানে তিনি থাকতেন, সেটি সংস্কার হচ্ছে। তিনি যেন থাকতে পারেন সেইভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে বাড়িটি।”
তিনি আরো বলেন, “তিন বছর আগে থেকেই তারেক রহমান রাষ্ট্র মেরামত নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। এজন্য তাঁর নিজের গবেষণা, আলোচনা চলমান রয়েছে। রাষ্ট্র মেরামতের কথা তিনি প্রতিনিয়তই নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে বিভিন্ন মহলে বলে যাচ্ছেন। আমরা আশা করি মানুষ যদি আমাদের পক্ষে রায় দেয়, নিশ্চয়ই তারেক রহমান যা মনস্থ করেছেন, তিনি যা গবেষণা করেছেন, তিনি যা লিপিবদ্ধ করেছেন, তিনি তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন।”