নিজস্ব প্রতিবেদক || জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও শক্তিশালী হবে। সম্প্রীতি নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে— গণতন্ত্র নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে— রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার।”
শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অবদান নিয়ে ‘সম্প্রীতির জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই অভ্যুত্থানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। শুধু মুসলমান নয়, সনাতন ধর্মাবলম্বী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, রিয়া গোপ, রুদ্র সেন ও দীপ্ত দেসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও শহীদ হয়েছেন। তাই, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণআন্দোলন।”
এনসিপির শীর্ষ নেতা বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের শুরু থেকেই জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এতে আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তারা নিজেদের সংখ্যালঘুদের একমাত্র রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করত এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংখ্যালঘুবিরোধী হিসেবে প্রচার করত। নির্বাচনের আগে ভয় সৃষ্টি করে ভোট ব্যাংক গড়ে তোলার রাজনীতি করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রাখা উচিত। কারণ, কোনো একটি সম্প্রদায়কে দলীয়করণ করা হলে, সেই দলের সব ব্যর্থতা ও অপরাধের প্রভাবও ওই সম্প্রদায়ের ওপর এসে পড়ে এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয়।”
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব হলো— দেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করা, যাতে কেউ নিজেকে অনিরাপদ মনে না করেন।”
ভারতে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়লেও বাংলাদেশকে সম্প্রীতির রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
তিনি দাবি করেন, ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে প্রচারণা চালানো হয়, সেটি একটি পরিকল্পিত ন্যারেটিভ। এই অপপ্রচার মোকাবিলায় দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংকটকালে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মন্দির পাহারা দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য নয়। তবে, সংকটের সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা বাংলাদেশের সম্প্রীতির শক্ত ভিত্তির প্রমাণ।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে সম্পত্তি দখল ও জমি নিয়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
তার ভাষায়, অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের সময় সবচেয়ে বেশি অগ্নিসংযোগ, জমি দখল ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ উঠে এসেছে। কিন্তু, বিচার না হওয়ায় এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই, এ ধরনের ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ এর সুফল পাবেন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে ভোটের অনুপাতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও সহজ হবে।”
তিনি বলেন, “গত ১৬ বছরে সংঘটিত সব সাম্প্রদায়িক হামলার বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গুম-খুন নয়, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোরও বিচার হওয়া উচিত।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “দেশে আবারও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে এবং বিরোধী মত দমনের পুরোনো কৌশল ফিরে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য এখনো অপরিহার্য।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আন্তরিক হতো, তাহলে জাতীয় স্বার্থে সবাই সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিল। তাই, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে।”
এনসিপি যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন— এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ও আলী আহসান জুনায়েদ, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের, সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল ও আর্চবিশপ হাউসের পরিচালক ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও, শহীদ হৃদয় তরুয়ার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া, জুলাই যোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ।