সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি || ‘‘আমি কিতা কইতাম, আমার আর কিচ্ছু নাই। স্বামী ছাড়া আমার আর সম্বল রইলোনা গো। দুই অবুঝ বাচ্চা লইয়া কেমন চলতাম। আমি কেমনে বাঁচতাম গো…’’
এভাবে বিলাপ করছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার পূর্ব ভবানীপুর গ্রামের গৃহবধূ চম্পা দেবনাথ। শুক্রবার (৩১ জুলাই) দিবাগত ভোররাতে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর রোববার (২ আগস্ট) সকালে উদ্ধার হয় তাঁর স্বামী হেমেন্দ্র দেব নাথের (৩৫) মরদেহ। দুই বছরের এক ছেলে ও পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়েকে নিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন চম্পা।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে কীর্তন অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে নৌকাডুবির এই ঘটনায় নিখোঁজ চারজনেরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ রোববার (২ আগস্ট) সকালে উপজেলার মইয়ার হাওরের রুয়ারকারা এলাকা থেকে স্থানীয়রা হেমেন্দ্র দেব নাথের ও পূর্ব ভবানীপুর এলাকার মৃত অনিল দেব নাথের ছেলে অধীর দেবনাথের (৩৫) ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে। এর আগে শনিবার (১ আগস্ট) একই ঘটনায় উদ্ধার করা হয় পূর্ব ভবানীপুর এলাকার সত্যেন্দ্র নাথ সতী (৬৫) এবং অরুণ দেবনাথের (৪৫) মরদেহ।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত ৮টার দিকে জগন্নাথপুর পৌরসভার পূর্ব ভবানীপুর এলাকার নয়জন একটি নৌকায় করে পাশের ভরাউট এলাকায় হিন্দু ধর্মীয় কীর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যান। অনুষ্ঠান শেষে রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে মইয়ার হাওরের বালুচর এলাকায় হঠাৎ দমকা হাওয়ার কবলে পড়ে নৌকাটি ডুবে যায়। নয়জনের মধ্যে পাঁচজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও চারজন পানিতে তলিয়ে যায়।
হেমেন্দ্র দেব নাথ পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে দিশেহারা তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। প্রতিবেশীরা জানান, দিনমজুরির আয়ে তার সংসার চলত। এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেল।
নিহতদের এক স্বজন জয়িতা দেবনাথ বলেন, ‘‘এমন ঘটনা আমাদের গ্রামে আর হয়নি। আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা সবাই দিনমজুর। পরিবারগুলো অসহায় হয়ে গেছে। সরকার পাশে না দাঁড়ালে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।’’
খবর পেয়ে শনিবার (১ আগস্ট) সকালে ঘটনাস্থলে যায় সুনামগঞ্জ ও সিলেট ফায়ার সার্ভিসের দুটি ডুবুরি দল। দিনব্যাপী যৌথ অভিযানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হাওরের বিশালতা ও দুর্ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট করতে না পারায় শনিবার (১ আগস্ট) রাত পর্যন্ত বাকি দুজনের সন্ধান মেলেনি। অবশেষে রোববার (২ আগস্ট) সকালে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের মরদেহ উদ্ধার হয়।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ না থাকায় মরদেহগুলো ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।