মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি || মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে হৃদরোগ, নিউমোনিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েডে আক্রান্তদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালে আসা অনেক ডেঙ্গু রোগী মশারি পাচ্ছেন না। এ কারণে সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সোমবার (৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের রোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে।
হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে আট দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ইয়াকুব মোল্লা। তিনি বলেন, “হার্টের অসুখ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। আমাদের ওয়ার্ডেই ডেঙ্গু রোগী রাখা হয়েছে। তারা মশারি ব্যবহার করছেন না। হার্টের চিকিৎসা করাতে এসে এখন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছি।”
হাসপাতালের কার্ডিওলজি ইউনিটের চার নম্বর কক্ষে আটটি শয্যার মধ্যে দুটিতে ডেঙ্গু রোগী, দুটিতে হৃদরোগী এবং বাকি শয্যাগুলোতে জ্বর, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এক নম্বর কক্ষের ১১টি শয্যার মধ্যে ছয়জন ডেঙ্গু রোগী এবং বাকি শয্যাগুলোতে এলার্জি, টাইফয়েড, নিম্ন রক্তচাপ ও খিঁচুনিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এছাড়া, তিন নম্বর কক্ষেও ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে অন্যান্য রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীকে মশারি ছাড়াই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

চাপ বাড়ায় হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেক রোগী
ডেঙ্গু রোগী মো. মোখলেস মাদবর বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অন্য রোগীদের কথা ভেবে মশারি চেয়েছিলাম। কিন্তু, হাসপাতাল থেকে কোনো মশারি পাইনি।”
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মনিকা আক্তার বলেন, “জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর যাদের পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়, তাদের মশারি দেওয়া হয়। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পাঁচ ও ছয় নম্বর কক্ষকে বিশেষ কর্নার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে, রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এসব কক্ষেও অন্যান্য রোগী ভর্তি করা হয়েছে।”
কয়েকজন ডেঙ্গু রোগী জানান, ওয়ার্ডের ফ্যান ঠিকমতো না চলায় গরমের কারণে দিনের বেলায় মশারি টানিয়ে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তারা সাধারণত রাতে মশারি ব্যবহার করেন।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। পুরুষ রোগীদের জন্য দুটি এবং নারী রোগীদের জন্য একটি আলাদা কর্নার করা হয়েছে। চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছু রোগীকে অন্য ওয়ার্ডেও রাখতে হচ্ছে।”
মশারির সংকটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে। কোথাও ঘাটতি থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা
মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে জেলার ছয়টি হাসপাতালে ৮৭৮ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৫৫ জন। তাদের মধ্যে ৪৯৫ জনই মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
আগস্টের প্রথম দিনে নতুন করে ১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। সোমবার পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৫০ জন, গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতজন এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজনসহ জেলায় মোট ৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।
মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম বলেন, “ডেঙ্গু আক্রান্ত ও অন্যান্য রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। তবে, রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় একই ওয়ার্ডে রাখতে হলে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে, যাতে এডিস মশার মাধ্যমে অন্য রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকে।”
এদিকে হাসপাতালের ভেতর ও বাইরের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনেরা। বিভিন্ন ওয়ার্ডে শয্যার নিচে ও আশপাশে ময়লা-আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নষ্ট লাইট ও ফ্যান এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অভিযোগ তুলেছেন তারা।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, লাইট, ফ্যান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”