নাটোর প্রতিনিধি || মেয়ের বয়স মাত্র এক মাস। পৃথিবীর আলো দেখার পর বাবার কোলে উঠার অপেক্ষাতেই ছিল সে। বাবা শামীম হোসেনও দূর প্রবাসে বসে দিন গুনছিলেন দেশে ফিরে মেয়েকে আদার করবেন। তবে, তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দেশে ফেরার আগেই সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন শামীম।
সংসারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে আট মাস আগে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিতু বেগমকে রেখে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শামীম। যাওয়ার সময় হয়তো কল্পনাও করেননি, প্রবাসের মাটিতেই শেষ হয়ে যাবে তার জীবনের সব স্বপ্ন। এক মাস আগে যখন তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে কন্যাসন্তান, তখন দূর সৌদি আরবে বসেই আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন তিনি। মেয়েকে কোলে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
নিয়তির নির্মম পরিহাস- যে বাবা মেয়েকে একবার দেখার জন্য দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাবার মুখই এখন আর কোনোদিন দেখতে পাবে না তার এক মাস বয়সী মেয়ে।
নিহত শামীম হোসেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় এলাকার মো. জাকির হোসেনের ছেলে। তার মৃত্যুর খবরে পুরো পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বামীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী মিতু বেগম। ছোট মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে যেন নির্বাক হয়ে পড়েছেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে পার্শ্ববর্তী হালতি খোলাবাড়িয়া এলাকার মিতু বেগমকে বিয়ে করেন শামীম। বিয়ের পর দীর্ঘদিন তাদের কোনো সন্তান হয়নি। সন্তান লাভের আশায় বিভিন্ন চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছে ছুটেছেন তারা। চার বছর পর মিতু গর্ভবতী হলে তাদের সংসারে আসে নতুন আশার আলো। তখন পরিবারের ভবিষ্যৎ আরো সুন্দর করার স্বপ্নে স্ত্রীকে রেখে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শামীম।
প্রবাসে থেকেও অনাগত সন্তানের প্রতিটি মুহূর্তের খবর নিতেন তিনি। এক মাস আগে যখন তার কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন শামীম। স্বজনদের সঙ্গে সন্তানের ছবি দেখে আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। স্বপ্ন ছিল, দেশে ফিরে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করবেন। সেই স্বপ্ন এখন কেবলই স্মৃতি।
শামীমের মা শাহীনুর বেগমের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। ছেলেকে হারানোর শোকের সঙ্গে এক মাস বয়সী নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহীনুর বেগম বলেন, “অনেক আশা নিয়ে আমার ছেলে সৌদি আরবে গিয়েছিল। সংসারের অবস্থা ভালো করবে, আমাদের মুখে হাসি ফোটাবে- এই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু সে আর ফিরে এলো না। আমার এক মাস বয়সী নাতনি তার বাবার জীবিত মুখটাও দেখতে পেল না। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আমার ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে দিন। আমার নাতনির ভবিষ্যতের জন্য সরকার যেন সহযোগিতা করে।”
স্বজনরা জানান, শামীমের মৃত্যু শুধু একজন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। যে সন্তান জন্মের পর বাবার কোলে ওঠার কথা ছিল, সেই সন্তান এখন বড় হবে বাবার স্মৃতি ছাড়াই। মায়ের মুখে গল্প শুনেই তাকে চিনতে হবে নিজের বাবাকে।
শামীমের বাড়িতে এখন আর প্রবাস থেকে ফোন আসবে না। স্ত্রী মিতুর অপেক্ষারও আর কোনো শেষ নেই। এক মাস বয়সী মেয়েটি হয়তো এখনো জানে না তার জন্য দূরদেশে বসে যে বাবা স্বপ্ন বুনছিলেন, সেই বাবা আর কোনোদিন তাকে কোলে নিতে ফিরবেন না।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান খান বলেন, “ঘটনাটি জানার পরই জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানানো হবে। পরিবারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে। মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার কাজ শুরু করেছে।”