কক্সবাজার প্রতিনিধি || অপরাধ করেছেন রমজান আলী। অথচ, সেই অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে যেতে হয়েছে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়াকে। ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের জন্য গ্রেপ্তার হওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, যে মামলার আসামি তিনি নন, সেই মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
কক্সবাজারে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার নতুন মোড় এসেছে আদালতের নির্দেশে পুলিশের পুনঃতদন্তে। তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। প্রকৃত আসামি রমজান অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন এবং পরে জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২ মার্চ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে দেখানো হয়। তবে, তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম-ঠিকানা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবু, সেই পরিচয়েই বিচার কার্যক্রম চলতে থাকে।
২০২২ সালের ১৩ জুন রমজান আলী আদালত থেকে জামিন পান এবং পরে আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠায়। কারাগারে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ইয়াবা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এরপর তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন।
জেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আদালতকে অবহিত করলে আদালত নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার পরিচয়, শারীরিক গঠন, পারিবারিক তথ্য ও শনাক্তকারী চিহ্ন যাচাই করে পৃথক প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির মায়ের নাম, স্ত্রীর নাম, সন্তান সংখ্যা, উচ্চতা, ওজন এবং শরীরের শনাক্তকারী চিহ্ন—সবকিছুই ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার সঙ্গে ভিন্ন।
পুলিশের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রকৃত আসামি রমজান এবং সোনা মিয়া একসময় একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছিলেন। পরে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই বাসায় বাস করতেন। সে সময় কোনোভাবে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কপি রমজানের হাতে চলে যায়। সেই নথি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পরিচয় দেন।
এ ঘটনায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, অভিযোগপত্রেই তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছিলেন যে আসামির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। তারপরও সেই পরিচয়ে বিচার চলেছে, আসামি জামিন পেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেছেন, “মামলার তদন্তে চরম গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। একজন ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করলে তার প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু, তা করা হয়নি। ফলে, প্রকৃত আসামি পালিয়ে গেলেও নিরপরাধ একজনকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে।”
কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস দাবি করেছেন, তার স্বামী কখনো কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না। র্যাব তাকে গ্রেপ্তারের পরই তারা জানতে পারেন, মাদকের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তিনি দাবি করেন, রমজান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার স্বামীর পরিচয় ছিল এবং সেই রমজানই প্রকৃত আসামি।
তিনি বলেন, “আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি আমরা। একইসঙ্গে প্রকৃত আসামি রমজান এখন কোথায়, কীভাবে তিনি অন্যের পরিচয়ে বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলেন এবং তদন্ত ও পরিচয় যাচাইয়ে কারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন— এসব প্রশ্নের উত্তর ও আদালতের পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছি।”
কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেছেন, “আদালতের নির্দেশে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। তদন্তে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।”