স্বাস্থ্য ডেস্ক || সকালে ঘুম থেকে উঠে এক শট লেবুর রস ও অলিভ অয়েল, খাবারে বাড়তি প্রোটিন, আবার চকোলেটেও স্বাস্থ্য উপকারের দাবি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নানা ওয়েলনেস ট্রেন্ড এখন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এসব অভ্যাসের সবটাই কি শরীরের জন্য সত্যিই উপকারী? বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু প্রবণতার পেছনে যুক্তি থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা অনেক দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যথেষ্ট শক্ত নয়।
লেবু-অলিভ অয়েলের শট, নাকি সালাদেই ভালো?
লেবুর রস ও অলিভ অয়েল—দুটিই রান্নাঘরের পরিচিত উপকরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ইনফ্লুয়েন্সার অবশ্য এই দুই উপকরণের মিশ্রণ সরাসরি ‘শট’ হিসেবে পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের দাবি, এটি ত্বক ভালো রাখতে ও হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে, বিষয়টি পুরোপুরি ভিত্তিহীনও নয়। বিশেষ করে অলিভ অয়েলের বেশ কিছু স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে। এতে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে এবং ধমনির দেয়ালকে নমনীয় ও কার্যকর রাখতে সাহায্য করে। অলিভ অয়েলে পলিফেনল নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে, যা শরীরে প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
তাই লেবুর রস ও অলিভ অয়েল খাওয়া বড় ঝুঁকির বিষয় নয়। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটো উপকরণ আলাদা করে ‘শট’ হিসেবে পান করার চেয়ে সালাদের সঙ্গে খাওয়াই ভালো। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবে অলিভ অয়েল ও লেবুর রস খাওয়ার যুক্তি আছে; কিন্তু একে আলাদা কোনো ‘মিরাকল ড্রিংক’ হিসেবে দেখার কারণ নেই।
‘প্রোটিনম্যাক্সিং’—যত বেশি, তত ভালো?
প্রোটিন নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। মাংস, ডিম ও দুধের মতো স্বাভাবিক উৎসের পাশাপাশি বাড়তি প্রোটিন পেতে অনেকে প্রোটিন পাউডার, প্রোটিনযুক্ত সিরিয়াল এমনকি পপকর্ন ও প্রেটজেলের মতো খাবারও বেছে নিচ্ছেন। এই প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে ‘প্রোটিনম্যাক্সিং’।
এর জনপ্রিয়তার পেছনে জিএলপি-১ ধরনের ওষুধের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব ওষুধ ব্যবহারে কেউ কম খাবার খেলে শরীরের বিদ্যমান পেশি ধরে রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে, বেশি প্রোটিন খেলেই বেশি পেশি তৈরি হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য দিনে প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ যথেষ্ট। আর যারা নিয়মিত ওজন তোলেন বা পেশি বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তাদের ক্ষেত্রেও প্রতি কেজি ওজনে ১.৬ গ্রামের বেশি প্রোটিন নিলে পেশি তৈরির ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার প্রমাণ খুব বেশি নেই।
অর্থাৎ, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়াকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম খাবার থেকে প্রোটিন নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ভাত, প্রোটিন আর সবজি—‘বয় কিবল’ কতটা ভালো?
ফিটনেসপ্রেমীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সহজ খাবারের প্রচলন রয়েছে—ভাত, কিমা বা গুঁড়া করা প্রোটিন এবং কোনো একটি সবজি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাবারকেই ‘বয় কিবল’ নামে নতুন করে জনপ্রিয় করা হচ্ছে।
পুষ্টিবিদ এটিকে বলছেন, “এটি মূলত পুরোনো দিনের বডি বিল্ডিংয়ের খাবারকে নতুনভাবে সাজানো।”
সঠিক পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার থাকলে এ ধরনের খাবার বেশ পুষ্টিকর হতে পারে। বিশেষ করে যারা প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা সহজভাবে পূরণ করতে চান, তাদের জন্য এমন সরল খাবারের কাঠামো কাজে লাগতে পারে।
তবে, প্রতিদিনের প্রতিটি খাবার একই ধরনের হওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা খাবারে বৈচিত্র্য রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ একই ধরনের পুষ্টি আরো অনেক খাবার থেকেই পাওয়া সম্ভব, যেগুলো স্বাদ ও বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বেশি আকর্ষণীয়।
চকোলেটও এখন ‘ফাংশনাল ফুড’
এখন শুধু চকোলেট বা চিপস হলেই হচ্ছে না। বাজারে এমন চকোলেট এসেছে, যেগুলো পিএমএসের উপসর্গ কমানোর দাবি করছে। আবার চিপসেও যোগ করা হচ্ছে বাড়তি প্রোটিন।
এ ধরনের খাবারকে বলা হচ্ছে ‘ফাংশনাল ফুড’—অর্থাৎ এমন খাবার, যেগুলো শুধু পুষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকার করা বা শরীরের কোনো প্রক্রিয়াকে উন্নত করার দাবি করে। এ ধরনের খাবার নতুন নয়। তবে, ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর জনপ্রিয়তাও বেড়েছে।
তবে, এসব খাবারের স্বাস্থ্য উপকারের দাবি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ফাংশনাল ফুডে যোগ করা পুষ্টি উপাদান বা প্রোবায়োটিকের পরিমাণ অনেক সময় এত কম থাকে যে, ক্লিনিক্যাল গবেষণায় উপকার পাওয়া মাত্রার সঙ্গে তা মেলে না।
পুষ্টিবিদ ড. ম্যারিয়ন নেসলের ভাষায়, এসব খাবার নিয়ে করা বেশির ভাগ দাবির “বিজ্ঞানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টি মার্কেটিংয়ের।”
তাহলে কোন পথে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন কোনো খাবার বা খাদ্যাভ্যাসকে স্বাস্থ্যকর বলে তুলে ধরা হচ্ছে। কখনো লেবু-অলিভ অয়েলের শট, কখনো বাড়তি প্রোটিন, আবার কখনো এমন খাবার, যা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারের দাবি করছে।
কিন্তু, স্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি উপাদান বা ট্রেন্ডের ওপর নির্ভর করাই মূল কথা নয়। অলিভ অয়েল ও লেবুর রস সুষম খাবারের অংশ হতে পারে, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে, বেশি প্রোটিন মানেই বেশি উপকার নয়। একইভাবে ‘ফাংশনাল ফুড’-এর প্যাকেটের গায়ে লেখা স্বাস্থ্য উপকারের দাবিও যাচাই না করে বিশ্বাস করার কারণ নেই।
সুস্থ থাকার জন্য তাই নতুন ট্রেন্ডের পেছনে ছোটা নয়, বরং বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুষম খাবার খাওয়া এবং কোনো বিশেষ স্বাস্থ্য দাবি করার আগে তার পেছনে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে কি না, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
* দ্য গার্ডিয়ার অবলম্বনে