আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্য আঘাত হানার পর এক হাজারের বেশি মানুষ নিঁখোজ রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই পর্যটক। স্থানীয় সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে পাহাড় থেকে প্রবল বেগে নেমে আসা এই বন্যায় ওই অঞ্চলে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
নেপাল ও চীন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে অন্তত ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই পাহাড়ি অঞ্চলে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার শত শত নাগরিক রয়েছে।
বুধবারের এই বন্যায় বেশকিছু ভিডিওতে দেখা যায়, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে আসার পর মানুষ জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন পানির নিচে তলিয়ে গেছে অথবা কাদার নিচে চাপ পড়েছে।
নেপাল পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানান, দেশটিতে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনই বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রর পর্যটক রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তে অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
বুধবার রাত পর্যন্ত নেপাল পুলিশ ১৬৫টি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে তিব্বত অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
প্রাথমিক খবরে নেপালি কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে এই বন্যা শুরু হয়ে থাকতে পারে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা পরবর্তীতে জানায়, শুরুতে যাকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে নদীতে পড়ার কারণে সৃষ্ট ঝাঁকুনির কম্পন। সেখানে ভূমিকম্পের কোনো ঘটনা মূলত ঘটেনি।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে- নেপাল-চীন রসুয়াগাধি সীমান্ত ক্রসিংয়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের ভূমিধসের কারণে পাথর-কাদায় ভরা এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।
নেপালের রসুয়া, ধাদিং ও নুওয়াকোট জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে নিখোঁজদের তালিকা তৈরির কাজ করছে এবং আকাশপথে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধার করে আনা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সরকারের সমস্ত সম্পদ নিয়োজিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উদ্ধারকারী দল কাদার নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
এই দুর্যোগের পর বেঁচে যাওয়া কয়েকজন দ্য গার্ডিয়ানকে জানান যে, কীভাবে তারা অলৌকিকভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন।
নেপালের রসুয়া জেলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিবেক কুমান নামের এক শ্রমিক বলেন, “আমি দৌড়াতে শুরু করি। তারপর ভূমিকম্পের মতো শব্দ করে পানির একটি বিশাল দেয়াল ধেয়ে এলো।” কাদা আর ধ্বংসাবশেষের পানির তোড়ে ভেসে গেলেও একটি আম গাছ ধরে প্রাণ বাঁচান তিনি। বিবেক বলেন, “আম গাছটি না থাকলে আমি ভেসে গিয়ে মারাই যেতাম।”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কেশব প্রসাদ বারাল (৬৮) নামের আরেকজন বলেন, “সোজা আমাদের দিকে একটা বিশাল কাদাস্রোত ধেয়ে আসছিল। যত কাছে আসছিল, ওটা আরও উঁচু হয়ে উঠছিল।”
তিনি আরো বলেন, “আমি স্ত্রীর হাত ধরে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোতে সে ভেসে গেল। চার-পাঁচ ঘণ্টা পর হেলিকপ্টার এসে আমাকে উদ্ধার করে। আমার স্ত্রী এখনো কাদামাটির নিচে কোথাও হারিয়ে আছে। সে আর নেই।”
চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বত সরকার অনুসন্ধান ও উদ্ধারে প্রায় ৮০০ উদ্ধারকারী, ১৫০টি যানবাহন, স্নাইপার ডগ এবং স্পিডবোট পাঠিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, “নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধার করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।”
‘হিমালয়ান গ্লেসিয়ার’ নামে একটি ট্যুর কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের একটি ট্র্যাকিং দলের ৪৭ জন সদস্যের সন্ধান মিলছে না, যার মধ্যে দুজন শিশুও রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন অস্ট্রেলীয়, ১০ জন কানাডীয়, ৯ জন নেপালি, ৮ জন আমেরিকান, ২ জন ব্রিটিশ, ২ জন সিঙ্গাপুরি এবং ১ জন রুশ-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংকেত পান্ডে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেন, যাদের প্রিয়জনেরা সেখানে আটকা পড়েছেন তাদের চিন্তায় তিনিও সমব্যথী। তবে নিখোঁজদের অবস্থান বা তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কিত সঠিক তথ্য পাওয়া এখনো বেশ কঠিন।
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র দুর্গতদের সহায়তায় জরুরি পদক্ষেপ ও অর্থ সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছে।