লাইফস্টাইল ডেস্ক || প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ ডালজাতীয় খাবার হৃদস্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে। হার্ভার্ড হেলথের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাংস বা কম স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেটের বদলে ডাল, মসুর ও মটরশুঁটির মতো খাবার খাদ্য তালিকায় রাখলে হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস হিসেবে ডালজাতীয় খাবারের জুড়ি নেই। এই দলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শিম, মসুর ডাল ও মটরশুঁটি। এগুলোতে রয়েছে জটিল কার্বোহাইড্রেট, যা শরীরে ধীরে ধীরে হজম হয়। একইসঙ্গে, এসব খাবারে ফাইবার বেশি, চর্বি কম এবং নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ থাকে।
হার্ভার্ডের ইনস্টিটিউট অব লাইফস্টাইল মেডিসিনের কুলিনারি হেলথকেয়ার এডুকেশন ফান্ডামেন্টালস (সিইএইচএফ) কোচিং প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. রানি পোলাকের মতে, “কম স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের বদলে ডালজাতীয় খাবার বেছে নিলে হৃদরোগের জন্য দায়ী সাধারণ কিছু শারীরিক সমস্যা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।”
যেভাবে হৃদস্বাস্থ্যের উপকার করে
ডালজাতীয় খাবারে দুই ধরনের উপকারী ফাইবার রয়েছে—দ্রবণীয় ফাইবার ও রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ। দ্রবণীয় ফাইবার পরিপাকতন্ত্রে অনেকটা স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এটি কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ পিত্তরস আটকে রেখে শরীর থেকে তা বের করে দিতে সহায়তা করে।অন্যদিকে, রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বৃহদান্ত্রে ভাঙে এবং সেখানে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এসব ব্যাকটেরিয়া শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে। অন্যান্য ফাইবারের সঙ্গে মিলে এসব উপাদান কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, প্রদাহ ও শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। আর এসব বিষয়ই হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
ডা. পোলাক বলেন, “ডালজাতীয় খাবার বেশ পেটভরা অনুভূতি দেয়, যা মানুষকে কম খেতে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে।” ডাল খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমতে পারে। এর একটি কারণ হলো, ডালজাতীয় খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। ফলে এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। আর ডায়াবেটিস থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়।
মাংসের বদলে ডাল কেন?
মাংস ও দুগ্ধজাত অনেক খাবারের প্রোটিনের সঙ্গে থাকে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, পরিশোধিত শস্য থেকে তৈরি সাদা পাউরুটি বা সাদা ভাতের মতো খাবারে প্রাকৃতিক ফাইবারের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এই ফাইবার কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তাই খাদ্যতালিকায় কম স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের কিছু অংশের জায়গায় ডালজাতীয় খাবার রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
ডাল খেলে পেট ফাঁপে?
ডালজাতীয় খাবারে ফাইবার বেশি থাকায় অনেকের পেটে গ্যাস, ফাঁপাভাব বা অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ডাল খান না, তাদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি দেখা যায়।
এ কারণে শুরুতেই বেশি পরিমাণে না খেয়ে ধীরে ধীরে ডালের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত খেতে থাকলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া অতিরিক্ত ফাইবারের সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং সময়ের সঙ্গে গ্যাসের সমস্যা কমে যেতে পারে।
শুকনো শিম বা বিনস রান্নার আগে সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন নতুন পানিতে রান্না করলে গ্যাস সৃষ্টিকারী উপাদান কমে। আরো কার্যকরভাবে কমাতে চাইলে দুই দফায় ভিজিয়ে নেওয়া যায়।
তবে, সময়ের অভাবে ডালজাতীয় খাবার এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যানজাত বিনসও ব্যবহার করা যেতে পারে। ডা. পোলাকের মতে, শুকনো বিনস ভিজিয়ে রাখা ও রান্নার বেশিরভাগ সময়ই সরাসরি তদারকির প্রয়োজন হয় না।
প্রতিদিনের খাবারে ডাল রাখবেন যেভাবে
খাদ্যতালিকায় ডাল যোগ করার সহজ উপায় হলো পরিচিত খাবারে মাংসের কিছু অংশের বদলে ডালজাতীয় খাবার ব্যবহার করা। যেমন—টাকো বা পাস্তা সসে কম সোডিয়ামযুক্ত কালো বা লাল বিনস যোগ করা যায়। মসুর ডাল রান্নার আগে ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় না। বাদামি, সবুজ ও কালো—বিভিন্ন ধরনের মসুর ডাল পাওয়া যায়। কমলা বা লাল মসুর ডাল মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটেই রান্না হয়ে যায়।
এছাড়া—
• ভাতের একটি অংশের বদলে রান্না করা মসুর ডাল যোগ করা যেতে পারে।
• সবুজ সালাদে রাজমা বা বরবটির বিচি দেওয়া যায়।
• নাশতা হিসেবে এডামামে খাওয়া যেতে পারে।
• সবুজ বা হলুদ মটরশুঁটি দিয়ে স্যুপ তৈরি করা যায়।
• ছোলা দিয়ে হুমাস বা ছোলার বিভিন্ন পদ তৈরি করা যায়।
• বিনস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পদ রান্না করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাবারের তালিকা থেকে ডাল বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং প্রতিদিনের পরিচিত খাবারের সঙ্গেই ডাল, মসুর, ছোলা, মটরশুঁটি বা বিভিন্ন ধরনের বিনস যোগ করা যেতে পারে।
সূত্র: হার্ভার্ড হেলথ