আন্তর্জাতিক ডেস্ক || আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে আর না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন এন চন্দ্রশেখরন। ভারতের বৃহত্তম বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের ৬৩ বছর বয়সী এই শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, তার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর বিষয়টি কয়েক মাস ধরে আলোচনার টেবিলে থাকলেও টাটা সান্সের পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তিনি আর নতুন করে এই দায়িত্ব নিতে চান না।
বুধবার (১২ আগস্ট) এন চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টাটা গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দামে বড় ধস নেমেছে। একইসঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়া, টাটা স্টিল এবং জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানার এই বিশাল বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে- তা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
টাটা সান্সের বার্ষিক সাধারণ সভার ঠিক কয়েক দিন আগে চন্দ্রশেখরনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত ট্রাস্টিদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিরোধকে দায়ী করা হচ্ছে। ট্রাস্টিদের এই পরিচালনা পর্ষদে বেশ কিছুদিন ধরেই ক্ষমতার দ্বন্দ ও উত্তেজনা চলছিল।
ভারতের অন্যতম বৃহত্ততম বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের মালিকানা কাঠামো বেশ ব্যতিক্রমী। মূল প্রতিষ্ঠান টাটা সান্সের ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ‘টাটা ট্রাস্টস’ নামক একটি দাতব্য সংস্থা। এই কাঠামোর কারণে গ্রুপটি কিছু কর সুবিধা ও আইনি ছাড় পেলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে- অলাভজনক দাতব্য উদ্দেশ্য ও বাণিজ্যিক লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে প্রায়শই সুশাসনের নানা সংকট তৈরি হয়।
টাটা সান্সের বোর্ডে টাটা ট্রাস্টসের মনোনীত তিনজন সদস্য রয়েছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বোর্ড সদস্য নিয়োগ, মূলধনী অর্থ অনুমোদন এবং টাটা সান্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিচালকদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছিল। তবে পর্ষদের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে টাটা গ্রুপ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
বর্তমানে এয়ার ইন্ডিয়াকে নতুন করে দাড় করানোর মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং ব্যবসায়িক সময় পার করছে টাটা গ্রুপ। ২০২২ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে এয়ার ইন্ডিয়া কিনে নেওয়ার পর এটি এখন তাদের অন্যতম বড় প্রকল্প। এর মধ্যেই পরিচালনা পর্ষদের ভেতরের এই রেষারেষি গ্রুপের সার্বিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
নিজের বিবৃতিতে চন্দ্রশেখরন জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে যখন তার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব বোর্ডে তোলা হয়, তখন একজন সদস্য এতে সম্মতি দেননি। কারো নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, “সর্বসম্মত সমর্থন না থাকায় আমি সিদ্ধান্তটি স্থগিত রাখার পথ বেছে নিই।” কিন্তু গত ছয় মাসেও সেই সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, “টাটা সান্স অত্যন্ত বিশাল একটি প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের অনেকগুলো কৌশলগত প্রকল্প এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। শুধু ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সময়ের জন্য একজন দক্ষ নেতাই যথেষ্ট নয়; বরং কর্মচারী, বিনিয়োগকারী ও অংশীদারদের আস্থা বজায় রাখতে নেতৃত্বের বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।”
২০১৭ সালে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন এন চন্দ্রশেখরন। তার আগে বহুল আলোচিত সাইরাস মিস্ত্রিকে হুট করে পদচ্যুত করা হলে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল। মিস্ত্রির স্থলাভিষিক্ত হিসেবেই দায়িত্ব পান তিনি।
চেয়ারম্যান হওয়ার আগে চন্দ্রশেখরন টাটা গ্রুপের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান ‘টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস’ (টিসিএস)-এর সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে টাটা গ্রুপে যোগ দেওয়া এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে ২০১৭ সালের এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘টাটা লাইফার’ (আজীবন টাটা পরিবারের সদস্য) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
স্বাধীন বাজার বিশ্লেষক অম্বরীশ বালিগা বলেন, চন্দ্রশেখরনের মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের হঠাৎ পদত্যাগের খবরে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নতুন উত্তরসূরি খুঁজে নেওয়ার জন্য তাদের হাতে এখনও প্রায় ছয় মাস সময় রয়েছে।” গ্রুপের ভেতর থেকেই হয়তো পরবর্তী নেতৃত্ব খুঁজে নেওয়া হবে বলে তিনি মনে করেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি