গবি প্রতিনিধি || সকালের নরম আলোয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে একদল তরুণ-তরুণী। কারো চোখে নতুন স্বপ্ন, কারো মনে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনের উত্তেজনা। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো তাদের নতুন পথচলা। তবে, এ যাত্রা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের নয়; নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলারও।
সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে জুলাই-২০২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের বুধবার (১২ আগস্ট) শপথবাক্য পাঠ করান গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নবীনদের স্বাগত জানায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় (গবি)।
স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়ার পর নবীনদের নিয়ে আয়োজন করা হয় নবীনবরণ সভার। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিএইচএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার মুহূর্তটি নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল আনুষ্ঠানিকতার নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়ও। ফার্মেসি বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী সিজন পালের কাছেও বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন নয়। তার কাছে এটি দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি বড় সুযোগ।
নতুন শিক্ষার্থী সিজন পাল বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের নতুন যাত্রায় পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে চান। শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যাশা তার।” মাদক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও অর্জনকে আরও এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখার কথাও জানান তিনি।
নবীনদের স্বপ্নের সঙ্গে মিশে আছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার দর্শনও। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম শফিকুজ্জামান নবীনদের উদ্দেশে বলেন, “গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন মহান মানুষ। তার জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা উচিত।” গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আরো ৪৭টি প্রতিষ্ঠানেও এদিন নবীনদের বরণ করে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। শিক্ষার্থীরা সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করবেন—এটাই তার প্রত্যাশা।

স্মৃতিসৌধে শপথ গ্রহণ করছেন নবীন শিক্ষার্থীরা
নবীনদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের যে পথ, সেখানে শুধু ভালো ফলাফল বা একটি চাকরি পাওয়াকেই সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখতে চান না প্রধান অতিথি ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষার আরো বিস্তৃত অর্থ। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য কেবল ভালো চাকরি পাওয়া হলে চলবে না; ভালো মানুষ হওয়ার লক্ষ্যও থাকতে হবে। জীবনে সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই সাফল্য অর্জন করতে হয়।
তিনি নবীনদের বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি সুন্দরভাবে কথা বলার দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাসী হওয়া, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান করার পরামর্শ দেন।
ভবিষ্যতের পথচলায় শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সৎভাবে লেখাপড়া করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া স্বাধীনতার অপব্যবহার না করে নিয়মিত পড়াশোনা, মাদক থেকে দূরে থাকা, নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা এবং সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
এভাবেই নবীনদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যায়টি শুধু পরিচয়পর্বে থেমে থাকেনি। স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ, শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা আর নিজেদের স্বপ্নের কথা জানানোর মধ্য দিয়ে তারা যেন নিজেদের কাছে নতুন এক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে—শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার।
স্মৃতিসৌধের সামনে উচ্চারিত সেই শপথ হয়তো একটি আনুষ্ঠানিকতার অংশ। কিন্তু, নবীনদের জন্য এর অর্থ আরো গভীর—বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলায় তারা কী শিখবে, কেমন মানুষ হবে এবং একদিন সেই শিক্ষা দিয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কী করবে, সেই যাত্রারই সূচনা।