তানভীর আহমেদ || দীর্ঘদিন বন্ধ ও লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরাতে বেসরকারি খাতের ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে এসব কারখানায় বিনিয়োগের জন্য শিল্পগোষ্ঠী ৮৬টি প্রস্তাব জমা হয়েছে। প্রস্তাবগুলোতে কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাই করছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিডা বলছে, সরকারি কারখানার প্রস্তুত জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস অবকাঠামো ও বিদ্যমান শিল্প-সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে নতুন করে শিল্প স্থাপনের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে।
বিডা সূত্র জানায়, গত জুনে বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। ওই সময় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উপযোগী ৪৪টি কারখানা চিহ্নিত করে বিডা। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি, বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এরপর বেসরকারি খাতের কাছে আগ্রহপত্র আহ্বান করা হলে ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ একাই ৩৫টি, আকিজ রিসোর্স গ্রুপ ১২টি, টি কে গ্রুপ ১০টি, ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ নয়টি, কাজী ফার্মস চারটি এবং ট্রান্সকম গ্রুপ তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে।
কৃষি থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি
প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি কারখানাগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, সৌরবিদ্যুৎ, খাদ্য ও পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, আসবাব ও পোলট্রিসহ নানা খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সরকারি ১৬টি কলকারখানার বিপরীতে ৩৫টি প্রস্তাব দিয়েছে। অটোমোবাইল সংযোজন, রিসোর্ট, ইকো ট্যুরিজম, কৃষিশিল্প, নির্মাণসামগ্রী, রেডিমিক্স, পেপার মিল, সৌরবিদ্যুৎ, পাদুকা, আসবাব, পোলট্রি ও ডেইরি খাতে তারা বিনিয়োগ করতে চায়।
গ্রুপটির পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেছেন, প্রস্তুত জমি ও বিদ্যমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া গেলে নতুন কারখানা স্থাপনের তুলনায় দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।
এরই মধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহী টেক্সটাইল মিল ও রাজশাহী জুট মিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল। এসব কারখানায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। সম্প্রতি খুলনার স্টার জুট মিলস ও সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসও ইজারা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিনিকলে কৃষিশিল্পের পরিকল্পনা
সরকারি চিনিকলগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য। ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে প্যারাগন গ্রুপ। একই কারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে কাজী ফার্মসও।
প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদী ইজারা পেলে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পশুখাদ্য উৎপাদন করা হবে। আখ চাষের জমিতে ধান ও ভুট্টা চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে নাবিল গ্রুপ, ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ এবং মিল্ক ভিটা। ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ গবেষণা ও উন্নয়ন, ফল-সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, জৈব সার, বীজ-আলু উৎপাদন, হিমাগার ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের জন্য নয়টি প্রস্তাব দিয়েছে।
মিল্ক ভিটা সেখানে দৈনিক ৩০ হাজার লিটার উৎপাদনক্ষমতার একটি আধুনিক রিফাইনারি স্থাপনে আগ্রহী।
ইভি, ডেটা সেন্টার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও আগ্রহ
রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ কারখানার জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন ধরনের শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাবও এসেছে। আকিজ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস হালকা প্রকৌশল, আসবাব, রাবার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নয়টি প্রস্তাব দিয়েছে।
টি কে গ্রুপ সরকারি কারখানার দীর্ঘমেয়াদী ইজারা নিয়ে অটোমোবাইল যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, চামড়ার জুতা ও সৌরবিদ্যুতের গ্লাসসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ দেখিয়েছে।
অন্যদিকে এক্সিলেন্ট সিরামিকস গ্রুপ বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, ব্যাটারি সিস্টেম, প্রকৌশল এবং টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও টেবিলওয়্যার উৎপাদনে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে।
কোন মডেলে বেসরকারি খাতে যাবে
তবে বিনিয়োগ প্রস্তাব এলেই কারখানাগুলো সরাসরি বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে না। বিনিয়োগ কাঠামো ও হস্তান্তরের মডেল নির্ধারণে কাজ করছে সরকার।
বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি প্রথম ডাককে বলেন, বেসরকারি খাত থেকে এত আগ্রহ পাওয়া গেছে যে তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারি বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছাড়ার জন্য একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইজারা, মুনাফা ভাগাভাগি কিংবা অন্য কোনো মডেলে বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এক মাসের মধ্যে নীতিমালা অনুমোদনের আশা রয়েছে।
বিডার আরেকটি সূত্র বলছে, গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিডার উদ্যোগে বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।