1. admin@prothomdak.com : admin :
  2. contentmgr4328@yahoo.com : contentmgr43 :
  3. contentmgr7168@outlook.com : contentmgr71 :
  4. editor@prothomdak.com : Golam Saroar : Golam Saroar
সাভারে বোমা আতঙ্ক: উগ্রবাদীদের আনাগোনা ফিরছে? - দৈনিক প্রথম ডাক
বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন

সাভারে বোমা আতঙ্ক: উগ্রবাদীদের আনাগোনা ফিরছে?

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার দেখা হয়েছে

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি || ঢাকার প্রবেশমুখ সাভার ও আশুলিয়ায় প্রায় দেড় মাসে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই দুই স্থানের পৃথক তিন এলাকায় অন্তত ১৬টি বোমা উদ্ধারের পাশাপাশি প্রেসার কুকারের মধ্যে তৈরি দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে একটি ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) লিফলেট উদ্ধারের তথ্যও জানিয়েছেন তারা। এসব ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত দেড় মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি সমাবেশে বিস্ফোরণ, ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে এক যুবকের হাতের কব্জি ও আঙুল উড়ে যাওয়া এবং এক অভিযানে ১৪টি পাইপবোমা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। পৃথক এসব ঘটনায় মামলা হলেও এর নেপথ্যে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এসব বিস্ফোরক তৈরি বা মজুত করা হচ্ছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

পুলিশ বলছে, ঘটনাগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, তল্লাশি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।

পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতি, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভাসমান মানুষের বসবাসের কারণে সাভার-আশুলিয়া অপরাধী ও উগ্রপন্থীদের কাছে সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে।

১২ দিনে ১৬ বোমা, দুই বিস্ফোরণ
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের লালটেক গোপের বাড়ি এলাকায় জামিআ ইলমুল ইলাহ সোসাইটি মাদ্রাসা ও জামে মসজিদের সামনের জঙ্গল থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ একটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, তিনজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি ড্রাম সেখানে রেখে গিয়েছিলেন। ড্রামের ভেতরে থাকা প্রেসার কুকারটি পরে স্থানীয় লোকজন বের করে মসজিদের মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেন।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কালো স্কচটেপে মোড়ানো বস্তুটি দেখতে পায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। দুপুর পৌনে ২টার দিকে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা জনশূন্য করে। বিকেল ৩টা ২৮ মিনিটের দিকে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। এ সময় বিকট শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং আকাশের দিকে সাদা ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।

ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকা ব্যবসায়ী নিবীর হোসেন বলেন, “এত শক্তিশালী বোমা, তা জানা ছিল না। যখন নিষ্ক্রিয় করা হয়, তখন বিকট শব্দে এলাকা কেঁপে ওঠে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।”

সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) ইমরান হোসেন জানান, সকাল ৮টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়।

সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, “বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দে এলাকা কেঁপে উঠেছে। এটা অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বোমা ছিল।”

এর আগে, গত ৩০ জুলাই মধ্যরাতে আশুলিয়ার চারাবাগ খেজুর বাগান এলাকায় জয়ী জেনারেল স্টোরের সামনে একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ আরেকটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার হয়। ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা সেটি একটি খোলা মাঠে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় করেন।

পুলিশ তখন জানিয়েছিল, কে বা কারা সেটি সেখানে রেখেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়।

এর মধ্যে, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দিবাগত রাতে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় একটি বাড়ি থেকে নয়টি বিস্ফোরক, বিপুল পরিমাণ গানপাউডার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এর আগে, হেমায়েতপুর এলাকা থেকে আরিফ হোসেন (২৮) নামে একজনকে পাঁচটি বিস্ফোরকসহ আটক করা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরো নয়টি পাইপবোমা উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে ১৪টি পাইপবোমা ও বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, “রাত সাড়ে ৩টার দিকে অভিযান শেষ হয়।”

পুলিশের দাবি, আরিফকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে পাঁচটি পাইপবোমা পাওয়া যায়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়।

ককটেল বিস্ফোরণ, এনসিপির সমাবেশেও বিস্ফোরণ
গত ১১ জুলাই আশুলিয়ার ভাদাইল পাবনারটেক পশ্চিমপাড়া এলাকায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে রনি (২০) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাঁ হাতের কব্জিসহ চারটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

আশুলিয়া থানা পুলিশ জানায়, রনি ওই ঘরে একা ছিলেন এবং ককটেল তৈরির চেষ্টা করার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি সিটিটিসির সদস্যরাও গিয়ে তদন্ত করেন।

গত ৬ জুলাই সাভারে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা শেষে সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাত পৌনে ১০টার দিকে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে নাবিলা তাসনিদের বক্তব্য চলার সময় মঞ্চের সামনের দিকে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত চারজন আহত হন। তাদের সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরে এনসিপির নেতাকর্মীরা সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ ঘটনায় প্রশাসনের সহায়তার অভিযোগ করেন।

পুলিশ ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে জানিয়েছিল, তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করার কথাও জানানো হয়।

ধোঁয়াশায় পুলিশ
দেড় মাসের ব্যবধানে কখনো বিস্ফোরণ, কখনো বিস্ফোরক উদ্ধার- এসব ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, সাভার-আশুলিয়ায় এসব বিস্ফোরক কীভাবে আসছে এবং কারা এগুলো তৈরি বা মজুত করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ঘটনাগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গত ৩০ জুলাই আশুলিয়ায় প্রেসার কুকারসদৃশ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আশুলিয়া থানায় মামলা হয়েছে। ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনাতেও মামলা হয়েছে।

আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছি। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় নির্দিষ্ট কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে কাজ করছি।”

হেমায়েতপুরের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তির ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ককটেল বিস্ফোরণে এক তরুণের আঙুল উড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, “ওই বিষয়টিও আমাদের কাছে আছে। আমরা এখনো এ নিয়ে কাজ করছি। এ ঘটনায় নির্দিষ্টভাবে কে জড়িত, আর কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত- এগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।”

অন্যদিকে, ১১ আগস্ট প্রেসার কুকারসদৃশ বোমা উদ্ধার, একই রাতে ১৪টি বোমাসহ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার এবং ৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে সাভার মডেল থানা এলাকায়। এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে।

১৪টি বোমাসহ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় আরিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা (উত্তর) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম বলেন, “বোমা উদ্ধারের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। বাসাটি যিনি ভাড়া নিয়েছিলেন, একজন পলাতক। তিনি স্ত্রীকে আনার কথা বললেও তাকে আনেননি। ছিলেন একজনই। তিনি এখনো পলাতক।”

বিষয়টি নিয়ে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট কাজ করছে এবং তাদের অগ্রগতিও রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে, এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারেননি ওসি। তিনি জানান, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন।

‘দুটি বড় ধ্বংসাত্মক বোমাই উদ্ধার হয়েছে’
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, “সাভার এলাকায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে- এমন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল।”

তিনি বলেন, “কেরানীগঞ্জে মাদ্রাসার ঘটনায় যারা জড়িত ছিল, তারা সেখান থেকে এসে সাভার এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলাম। আমাদের কাছে তথ্য ছিল, তারা দুটি বড় ও ধ্বংসাত্মক বোমা তৈরি করেছে। দুটিই আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি।”

এসপি বলেন, “প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যেই দুটি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।” এ ছাড়া, অনুসন্ধানের পর বোমা তৈরির অনেক সরঞ্জাম উদ্ধার করে সাভারেই ধ্বংস করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শামীমা পারভীন বলেন, “কোনো অঘটন ছাড়াই আমরা সবকিছু উদ্ধার করতে পেরেছি।”

সাভারকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখানে শ্রমিক ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি। আজ আসেন, কাল থাকেন না- এমন পরিস্থিতি রয়েছে। গ্রামে মানুষজন একে অপরকে চেনে। কিন্তু সাভারে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারণে বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি এবং তারা অস্থায়ীভাবে থাকেন। ঘনবসতি ও এসব বিষয় মিলিয়ে জায়গাটি হয়তো উগ্রবাদীদের কাছে উপযুক্ত মনে হতে পারে।”

পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “ডিএসবি ও ডিবিকে দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে টহল বাড়ানো, রাস্তায় সন্দেহভাজন কাউকে পাওয়া গেলে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ বাড়ানো হয়েছে।”

শ্রমিকেরা যেসব এলাকায় থাকেন, সেসব এলাকায় ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই এবং টহল আরো বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে শামীমা পারভীন বলেন, “আমরা সাভারে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ পুলিশ। আর জনগণ প্রায় কোটি। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া শুধু পুলিশের পক্ষে এককভাবে পরিপূর্ণভাবে এসব কাজ করা সম্ভব নয়।’

তিনি জানান, বিভিন্ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি করা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে।

“জনগণের আমাদের ওপর হয়তো আস্থা তৈরি হয়েছে। এ কারণে তারা আমাদের তথ্য দিচ্ছেন। আমরা তো জনগণের কাছ থেকেই তথ্য নেব, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ করব”, যোগ করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

কেন সাভার?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন- সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলো অপরাধীদের একধরনের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, “স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে অল্প টাকায় থাকা এবং বোমা-ককটেল তৈরির মতো কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ায় অপরাধীরা এসব এলাকা বেছে নেয়। অন্য জায়গা থেকেও অপরাধীদের এনে এখানে রাখা হয়। এসব ঠেকাতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও পুলিশের সোর্স সক্রিয় করতে হবে।”

তার পরামর্শ, বাড়ির মালিকদের ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র রাখতে হবে এবং ভাড়ার চুক্তির একটি কপি থানায় জমা দিতে হবে। এতে অপরাধীদের এসে বসবাসের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নাশকতার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে শাস্তি দৃশ্যমান করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও সতর্ক থাকতে হবে এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তবে এর নামে ভিন্নমতের কাউকে যেন হয়রানি, হামলা বা মামলার শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।”

বিস্ফোরকের উপাদান নিয়েও নজরদারির পরামর্শ
প্রেসার কুকার বোমা তৈরির উপাদান সম্পর্কে ড. তৌহিদুল হক বলেন, “কিছু উপাদান বাইরে থেকে আনতে হয়। আবার কিছু উপাদান দেশেও পাওয়া যায়। সেগুলোর সঙ্গে বাইরে থেকে আনা উপাদান মিশিয়ে ভয়ানক উপাদান তৈরি করা হয়।”

তার মতে, বাইরে থেকে আসা এসব উপাদান কেনাবেচার ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “যারা এগুলো বিক্রি করেন, তারা কার কাছে বিক্রি করছেন, কে কিনছেন, কী উদ্দেশ্যে কিনছেন- এসবের রেকর্ড রাখা যেতে পারে। ক্রেতার মোবাইল নম্বর ও দোকানের ঠিকানা রাখার ব্যবস্থা করা গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ওই রেকর্ড ধরে নজরদারি করা সহজ হবে।”

তবে বাংলাদেশে এটি বাস্তবায়ন কঠিন বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, দোকানের বাইরে বিভিন্নভাবে এসব জিনিস কেনাবেচা হতে পারে। তারপরও একটি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব বলে মনে করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

সাভারে জঙ্গি তৎপরতার পুরনো ইতিহাস
সাভারে বিস্ফোরক ও জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা নতুন নয়। গত দুই দশকে এ এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য গ্রেপ্তার এবং বোমা বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

সাভারে জঙ্গি তৎপরতার বড় ঘটনা ঘটে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। সেদিন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় একযোগে প্রায় ৪৫৯টি টাইম বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।

সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আধা ঘণ্টাজুড়ে চলা ওই হামলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মানুষ আহত হন। একই দিন বিকেলে সাভারে ছয়টি বোমা বিস্ফোরণে ১০ বছরের শিশু আবদুস সালাম নিহত এবং তিন বছর বয়সী আনিক আহত হয়।

বিকেল ৩টার দিকে বাড়ির সামনে বোমা বিস্ফোরণের পর আবদুস সালামকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সাভার পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। ওই দিনের হামলার দায় পরে লিফলেট দিয়ে স্বীকার করে জেএমবি।

এর পাঁচ বছর পর ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর সাভারের বলিয়ারপুর এলাকা থেকে জেএমবির ঢাকা বিভাগের প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- শরিফুল ইসলাম লিকন ওরফে রানা, জেএমবির এহসার সদস্য শাহিনুল ইসলাম এবং গায়েরি এহসার সদস্য চেইনুর রহমান। তাদের কাছ থেকে আটটি পেট্রলবোমা, বোমা তৈরির দেড় কেজি উপকরণ, দুটি পরিচয়পত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল র‌্যাব।

র‌্যাবের সে সময়ের ভাষ্য অনুযায়ী, শরিফুল জেএমবির ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর সংগঠনটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিলেন। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় নাশকতার পরিকল্পনা এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে।

শরিফুল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জয়পুরহাটে সিরিজ বোমা হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছিলেন বলে তখন জানিয়েছিল র‌্যাব। এর সাত বছর পর ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল সাভার থেকে জেএমবির সরওয়ার-তামিম গ্রুপের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- তামিম দাড়ি, কামরুল হাসান ও মো. মোস্তফা মজুমদার।

র‌্যাব-৪-এর একটি দল ঝিটকা-গাবতলী রুটের ‘ভিলেজ লাইন’ পরিবহনের একটি বাসে অভিযান চালিয়ে রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তাদের গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র, প্লাস্টিক বিস্ফোরক, পাঁচটি গুলি ও বোমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার তামিম দাড়ি ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিলেন।

এছাড়া, ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই সাভারের আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাবাড়ি এলাকায় ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে একটি বাড়ি ঘিরে রাখার পর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন সারোয়ার-তামিম গ্রুপের চার সদস্য মোজাম্মেল, ওরফানুল, আলমগীর ও রাশেদুল নবী আত্মসমর্পণ করেন।

র‌্যাব জানিয়েছিল, পোশাকশ্রমিক পরিচয়ে এক মাস আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন তারা। বাড়ির মালিকের সন্দেহ হলে র‌্যাবকে জানানো হয়। তারা বাড়িটি ঘিরে ফেললে ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হলে পাল্টা গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আত্মসমর্পণের পর র‌্যাব জানায়, বাড়িটিতে আইইডি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।

সতর্কতা ও আইনগত ব্যবস্থা জরুরি
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো এবং পুলিশের সোর্স সক্রিয় করা জরুরি। যখন পুলিশের সোর্সগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন এ ধরনের অপরাধীরা নানাভাবে সক্রিয় হয়। তারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী ঢাকার আশপাশের কোনো একটি এলাকা বেছে নেয়। তাই পুলিশের সক্রিয়তা ও ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।”

নাশকতার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শাস্তি দৃশ্যমান করার ওপরও জোর দেন তিনি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকতে হবে। ৫ আগস্টের পর এটি প্রথম নির্বাচিত সরকার। এখনো রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্নে ন্যূনতম মূল্যবোধকেন্দ্রিক সম্পর্কের যথেষ্ট ঘাটতি আছে।”

তার মতে, এই ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো একক গোষ্ঠী সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণকে সম্পৃক্ত করে সতর্ক থাকতে হবে। তবে, সতর্কতার নামে রাজনৈতিকভাবে বিপরীত মতাদর্শের কারো ওপর আক্রমণ, হামলা বা মামলা যেন না হয়, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ

Categories

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed By: SISA IT