নিজস্ব প্রতিবেদক ||প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “দেশের চলমান গ্যাস সংকট সামাল দিতে জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। নষ্ট হয়ে যাওয়া গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামো মেরামতের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি যন্ত্রাংশ সংগ্রহে কিছুটা জটিলতা থাকলেও দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তথ্য জানান তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “শিল্পকারখানা সচল রাখা এবং ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো নিয়ে নিয়মিত সরকারি ব্রিফিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
বিদ্যুতে কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ
গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ডা. জাহেদ। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমবে এবং শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহের চাপও কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করছে সরকার।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলার সম্ভাবনাময় গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ডা. জাহেদ বলেন, “ভোলায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে। সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাইপলাইন স্থাপনের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।”
প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভোলার গ্যাস কীভাবে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।”
১৫০ কূপ খনন ও পুনঃখনন
দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
ডা. জাহেদ বলেন, “দেশের ভূগর্ভে ঠিক কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও হিসাব অনুযায়ী দেশে উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।”
অর্থনীতির পরিধি বাড়ার সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশীয় উৎসের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতেই নতুন করে অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান সংকটের পুরো দায় বর্তমান সময়ের ওপর দেওয়া ঠিক হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এটি কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল।”
চাপে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার
দেশের গ্যাস পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধিরও প্রভাব রয়েছে। ডা. জাহেদ বলেন, “গত বছরের একই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৪ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৪ ডলারে উঠেছে। সামনে দাম ৩০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।”
এ অবস্থায় সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। একদিকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া- দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
তবে লোডশেডিংকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছে না সরকার। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া বর্তমান বাস্তবতায় স্বল্পমেয়াদে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইউরোপের চাহিদায় বাড়ছে চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির বাড়তি চাহিদার পেছনে ইউরোপের পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে বলে জানান ডা. জাহেদ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার পাইপলাইননির্ভর গ্যাস থেকে সরে এলএনজির দিকে বেশি ঝুঁকেছে। এতে বিশ্ববাজারে এলএনজির চাহিদা বেড়েছে।
সামনে শীত মৌসুমকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের গ্যাসের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাজারে। ফলে বাংলাদেশকেও তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য একদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যতটা সম্ভব কমানো, অন্যদিকে শিল্প ও অর্থনীতির কর্মকাণ্ড সচল রাখা। এই দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই বর্তমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।