নিজস্ব প্রতিবেদক || দেশে অতীতের মতো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা যাতে আর ফিরে আসতে না পারে, একইসঙ্গে ক্ষমতায় থাকা কেউ যেন ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা তৈরিতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, “অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব না থেকে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) আয়োজিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, “শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করলে হবে না। দেশে অন্যায়, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটলে, সেগুলো দেখার এবং প্রতিবাদ করার মানসিকতা থাকতে হবে। যারা এসব ঘটনা দেখেও চোখ বন্ধ করে থাকেন, তাদের বিবেক জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদ যেন আবার পুনর্বাসিত না হয় এবং আমরাও যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে না উঠি, সেজন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।”
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের অধিকার, আইনের শাসন ও স্বাধীনতার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে এগিয়ে যাওয়াই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।”
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “ওই সময়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে হাত-পা হারিয়েছেন, আবার অনেকে স্থায়ীভাবে আহত হয়েছেন। অনেক পরিবার এখনো স্বজন হারানোর বেদনা বহন করছে। এসব ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও কেউ কেউ তা অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, “চোখে আলো থাকলেই সব দেখা যায় না। মানুষের অধিকার ও অন্যায় দেখতে হলে অন্তরের চোখও খোলা রাখতে হয়।”
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, “সমাজের একটি অংশকে বাদ দিয়ে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেক প্রতিভা রয়েছে, প্রয়োজন শুধু সেই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।”
ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিভা বিকাশে কাজ করছে। কয়েক বছর ধরে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদেরও এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। তাদেরও সমাজে সমান অধিকার ও মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, “এ ধরনের উদ্যোগকে আরো বিস্তৃত করতে সরকারি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। আমি বিষয়টি নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।”
দেশের প্রতি নাগরিকের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রত্যেকের উচিত নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করা।”
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নাগরিকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।”
ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের চেষ্টাকারীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, “কোথাও অন্যায় হলে সেটি চিহ্নিত করে দেওয়া নাগরিকের দায়িত্ব। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থানের কারণে অন্যায়কে সমর্থন করা উচিত নয়।”
তিনি বলেন, “জন্মভূমির প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর বিষয়গুলোর একটি। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে।”
অনুষ্ঠানে আয়োজকেরা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-ই-ইলাহি ও নাত-ই-রাসুল (সা.) এবং রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তারা। এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা’।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম নুরউদ্দিন খান, ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সেলর এসরাফিল আমিরি গোর্জাদ্দিনি, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক।
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।