চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি || পদ্মার শাখা নদীতে গোসল করতে নেমে এক সঙ্গীকে বাঁচাতে গিয়ে একে একে তলিয়ে যায় পাঁচ শিশু। মৃত্যুর ভয়াল থাবাতেও শিথিল হয়নি শৈশবের বাঁধন। উদ্ধারের সময়ও তারা আঁকড়ে ছিল একে অপরের হাত। তিনটি পরিবারের এই পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে এখন স্তব্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর চাকলা গ্রাম; যেখানে পাশাপাশি খোঁড়া পাঁচটি কবরে একসঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছে পুরো গ্রামের আনন্দ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে সদর উপজেলা দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো এলাকাকে।
নিজাউদ্দিনের দুই মেয়ে সুমাইয়া ও সুরাইয়া, প্রবাসী মাসুদ আলীর দুই মেয়ে সুমাইয়া ও আরীবা এবং শরিফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা- এই পাঁচ শিশু একসঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল নদীর জলে। প্রতিদিনের হাসিখুশি মুহূর্তটি যে, মুহূর্তের মধ্যেই বিষাদে রূপ নেবে, তা ছিল ধারণার বাইরে।
নদীতে নামার পর হঠাৎ করেই একজন শিশু পানির গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। তাকে ডুবতে দেখে চিৎকার বা পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং বাঁচাতে বাকি চারজন একে একে হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। কিন্তু, একের পর এক পাঁচটি নিষ্পাপ প্রাণ তলিয়ে যায় নদীর অতলে।
উদ্ধার অভিযানের সেই দৃশ্যটি উপস্থিত স্থানীয়দের চোখে জল এনে দেয়। পানি থেকে যখন শিশুদের নিথর দেহগুলো তোলা হচ্ছিল, তখন দেখা যায়- মৃত্যুর সময়েও তারা কেউ কারো হাত ছেড়ে দেয়নি। বাঁচার শেষ চেষ্টায় ছোট ছোট হাতগুলো একে অপরকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল। নদী তাদের প্রাণ কেড়ে নিলেও, শৈশবের সেই ভালোবাসা আর বাঁধনকে আলাদা করতে পারেনি।
সরেজমিনে চর চাকলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মারা যাওয়া তিন পরিবারেই চলছে স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে আহাজারিতে। বিশেষ করে প্রবাসী মাসুদের বাড়ির উঠানে নেমে এসেছে শোকের নীরব স্তব্ধতা। একদিকে সুমাইয়া, অন্যদিকে ছোট মেয়ে আরিবা, উঠানের মাঝখানে দুই নিষ্পাপ মেয়ের নিথর দেহ ঘিরে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছেন কান্নাভেজা আত্মীয়-স্বজন। শত চেষ্টাতেও তাদের চোখের পানি আর বুকের হাহাকার থামাতে পারছিলেন না সমবেদনা জানাতে আসা প্রতিবেশীরা।
গ্রামের বাসিন্দা সুলতান আলী চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “মরা পদ্মায় কত দুর্ঘটনা দেখেছি, কিন্তু এমন মর্মান্তিক দৃশ্য কখনো দেখিনি। বাঁচানোর জন্য ছোট ছোট হাতগুলোর এই আকুতি সারা জীবন আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।”
আরেক বাসিন্দা শুকরদি বলেন, “এই গ্রামের নদীতে কখনো একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি। দু-একজনের ডুবে যাওয়ার কথা শুনেছি, কিন্তু এভাবে পাঁচ শিশুর একসঙ্গে চলে যাওয়া আমরা কেউ কোনোদিন দেখিনি।”
পাশাপাশি দাফন
এদিকে, ঘটনার পর বিকেলে চর চাকলা গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি খোঁড়া হয় পাঁচটি কবর। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৭টা; শত শত মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর জানাজা। এরপর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চর চাকলা কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।
অন্ধকার নেমে আসা সন্ধ্যায় একই সারিতে যখন একে একে পাঁচটি নিথর দেহ মাটির নিচে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন স্বজন ও গ্রামবাসীর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে রাতের বাতাস।
এর আগে, বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”