নিজস্ব প্রতিবেদক || কোম্পানি নিবন্ধন ও পরিচালনায় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু, প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, শেয়ার হস্তান্তরে সত্যতা যাচাই এবং সংঘস্মারক সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ সংশোধন করে ‘কোম্পানি (তৃতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কোনো কোম্পানির শেয়ার কাগজে একজনের নামে থাকলেও প্রকৃত সুবিধাভোগী বা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি অন্য কেউ হলে তাঁর পরিচয় প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির নিবন্ধন ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংরক্ষণ, শেয়ার হস্তান্তরের ডিজিটাল যাচাই এবং কোম্পানির সাধারণ সভার নোটিশ ই-মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর ওপর অংশীজনদের মতামত নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকৃত মালিকের তথ্য দিতে হবে
খসড়া সংশোধনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ বা প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্ত করা। প্রস্তাবিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, শুধু কোম্পানির শেয়ার রেজিস্টারে নাম থাকা ব্যক্তিই প্রকৃত মালিক হিসেবে বিবেচিত হবেন না। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করেন, এমন ব্যক্তিও এর আওতায় আসবেন।
এ ছাড়া, কোম্পানির পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণে প্রভাব রাখেন কিংবা কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন, এমন ব্যক্তিকেও প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত ৩৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শেয়ারের নিবন্ধিত মালিক এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক আলাদা হলে প্রকৃত মালিকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য ঘোষণা করতে হবে। মালিকানায় পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে নতুন ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০০ টাকা অতিরিক্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। কোম্পানিকেও প্রকৃত মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রকৃত মালিকানা ঘোষণা না করা হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ওপর ওই ব্যক্তির অধিকার কার্যকর না হওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নিবন্ধন ও নথিপত্রে বাড়বে ডিজিটাল ব্যবস্থা
খসড়া আইনে কোম্পানির নথিপত্রের পরিধি বাড়িয়ে ইলেকট্রনিক রেকর্ড, নোটিশ, চুক্তি, ফরম ও রেজিস্টার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি ডিজিটালভাবে তৈরি ও সংরক্ষণের আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।
নির্দিষ্ট আদর্শ সংঘস্মারক ও সংঘবিধি ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোম্পানি নিবন্ধনের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের ব্যবস্থার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এতে অপেক্ষাকৃত সরল ও নির্ধারিত কাঠামোর কোম্পানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কোম্পানির নাম ব্যবহারে নতুন বিধান
কোম্পানির নামের শেষাংশ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নামের সঙ্গে ‘পাবলিক সীমিতদায় কোম্পানি’ অথবা ‘পিএলসি’ এবং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘সীমিতদায়’ অথবা ‘লি.’ ব্যবহারের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে ওয়ান পারসন কোম্পানি বা ‘ওপিসি’ ব্যবহারের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
এ ছাড়া, আগে নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির নামের সঙ্গে অত্যধিক সাদৃশ্যপূর্ণ নামে নতুন কোম্পানি নিবন্ধনের সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুল বা অসতর্কতার কারণে এমন নাম নিবন্ধিত হলে রেজিস্ট্রারের নির্দেশে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে নাম পরিবর্তন করতে হবে।
নির্দেশ অমান্য করলে কোম্পানির জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।
সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের অনুমোদন কমানোর প্রস্তাব
কোম্পানির ব্যবসার উদ্দেশ্য বা কার্যক্রমের পরিধি পরিবর্তনের জন্য সংঘস্মারক সংশোধনের প্রক্রিয়াও সহজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে অনুমোদনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে সদস্য, সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পাওনাদারদের স্বার্থ রক্ষায় আপত্তি জানানোর সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে পাওনা পরিশোধ বা নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রস্তাবিত সংশোধনীতে রাখা হয়েছে।
শেয়ার হস্তান্তরে আসছে যাচাই
শেয়ার হস্তান্তরে জালিয়াতি ঠেকাতে আরো কঠোর যাচাইয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। হস্তান্তরকারীর স্বাক্ষরের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপস্থিত হয়ে পুনরায় স্বাক্ষর করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিদেশে থাকা ব্যক্তি বা বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে নথি সত্যায়নের সুযোগ থাকবে। যুক্তিসংগত কারণে রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে কমিশন পাঠিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার ব্যবস্থারও প্রস্তাব রয়েছে।
এর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার হস্তান্তরের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সভার নোটিশ যাবে ই-মাধ্যমে
কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ও অন্যান্য সাধারণ সভার নোটিশ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সভার জন্য কমপক্ষে ২১ দিনের নোটিশ দেওয়ার বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে ই-মাধ্যমে সদস্যদের কাছে নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এতে বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক শেয়ারহোল্ডার থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে কাগজনির্ভর যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
পরিচালকদের যোগ্যতামূলক শেয়ার
কোম্পানির সংঘবিধিতে নির্ধারিত যোগ্যতামূলক শেয়ার পরিচালকদের ধারণের বিধানও সংশোধনীতে রাখা হয়েছে। নিয়োগের আগে ওই শেয়ার অর্জন করা না হলে নিয়োগের পর ৬০ দিনের মধ্যে, অথবা সংঘবিধিতে নির্ধারিত কম সময়ের মধ্যে তা অর্জনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোম্পানির তথ্য যাবে সংশ্লিষ্ট সংস্থায়
রেজিস্ট্রারের কাছে কোম্পানি ও প্রকৃত মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে এসব তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষ করে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে বৈধ অনুরোধের ভিত্তিতে বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোম্পানি বা প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, দুর্নীতি, কর ফাঁকি বা গুরুতর অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বন্ধক ও চার্জ নিবন্ধনেও ডিজিটাল ব্যবস্থা
কোম্পানির সম্পদের ওপর সৃষ্টি হওয়া বন্ধক বা চার্জ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণেও ডিজিটাল ব্যবস্থা আনার প্রস্তাব রয়েছে। নিবন্ধিত বন্ধক ও চার্জের তারিখভিত্তিক সূচি ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া চার্জ নিবন্ধনের নথি দাখিলের সময়সীমা বর্তমান ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ৩০ দিন করার প্রস্তাবও রয়েছে।
সব মিলিয়ে খসড়া সংশোধনীতে কোম্পানি নিবন্ধন ও পরিচালনায় প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, শেয়ার লেনদেনে জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং সরকারি নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।