বিনোদন প্রতিবেদক || ঢালিউডের ‘বুনো সুন্দরী’খ্যাত চিত্রনায়িকা সাদিকা পারভীন পপি। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও নিজের জাত চিনিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রী।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পপির জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক ওয়াকিল আহমেদ। একই সঙ্গে পপিকে নিয়ে তার সঙ্গে সিনেমা নির্মাণের অপূর্ণ স্বপ্নের কথাও স্মরণ করেছেন তিনি।
১৯৭৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন পপি। ১৯৯৫ সালে ‘লাক্স আনন্দ বিচিত্রা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে শোবিজে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘আমার ঘর আমার বেহেস্ত’। তবে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমা ‘কুলি’, যা বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায়।

পারিবারিক দ্বন্দ্ব পপির ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গত বছর জীবনের নানা উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে এই অভিনেত্রী বলেন, পরিবারের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হয়, তবে নিজের ভিত্তি শক্ত না করে সবার জন্য সব কিছু বিলিয়ে দেওয়া উচিত নয়
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পপি কাজ করেছেন সোহানুর রহমান সোহান, মনতাজুর রহমান আকবর, দিলীপ সোম, কমল সরকার, বাদল খন্দকার, নার্গিস আক্তার ও সামিয়া জামানসহ অনেক গুণী নির্মাতার সঙ্গে। তবে নির্মাতা ওয়াকিল আহমেদের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।
পপির জন্মদিন উপলক্ষে নিজের ফেসবুক পোস্টে সেই গল্পই তুলে ধরেছেন ওয়াকিল আহমেদ। তিনি লিখেছেন, “জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সুঅভিনেত্রী সাদিকা পারভিন পপির কথা বলছি। আমি একজন মুভি নির্মাতা, লেখক, আর পপি একজন জনপ্রিয় নায়িকা। এখন পর্যন্ত আমাদের দুজনের মধ্যে রয়েছে সুন্দর আস্থা এবং বন্ধুত্ব। তারপরও আজ অবধি আমাদের দুজনের সম্মিলনে—মানে আমি নির্মাতা আর পপি নায়িকা হিসেবে—একটি মুভিও রূপালি পর্দার মুখ দেখেনি।”

একসময় চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করলেও হঠাৎ করে অন্তরালে চলে যান পপি। এর মধ্যে বিয়ে করে সংসারীও হয়েছেন। ২০২০ সালের নভেম্বরে বিয়ে করেন এই অভিনেত্রী
পপিকে নিয়ে দুটো সিনেমার কাজ শুরু করেছিলেন ওয়াকিল আহমেদ। কিন্তু তা শেষ করতে পারেননি। তা স্মরণ করে এই পরিচালক বলেন, “পপিকে নায়িকা করে ‘কোটিপতি’ ও ‘কালা দুনিয়া’ নামে দুটি মুভির কাজ শুরু করেছিলাম। ‘কোটিপতি’ মুভিতে পপির নায়ক ছিলেন শাকিব খান। আরো ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, শাহনাজ, ওয়াসিমুল বারী রাজীব, দিলদারসহ অনেকে। ‘কোটিপতি’ ছিল পপি ও শাকিব জুটির প্রথম মুভি। বেশ কয়েকদিন শুটিংও হয়েছিল। হঠাৎ করেই শিডিউল জটিলতায় শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। আর কোনোদিন ক্যামেরা চলেনি। মুভিটিও আলোর মুখ দেখেনি।”
‘কালা দুনিয়া’ সিনেমার কাজ বন্ধ হওয়ার কারণ জানিয়ে ওয়াকিল আহমেদ বলেন, “কয়েক বছর পর আবার পপিকে নায়িকা করে ‘কালা দুনিয়া’ নামে আমি আরেকটি মুভি শুরু করি। এবার পপির নায়ক নির্বাচিত হন রুবেল। ভিলেন হিসেবে ছিলেন ওমর সানী। মুভিটির একটানা শুটিং করার উদ্দেশ্যে আমরা পুরো ইউনিট নিয়ে কক্সবাজার চলে যাই। পপি ও সানী পরদিন আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরেরদিনই হঠাৎ করে ক্যাপাসিটি ট্যাক্স নিয়ে আন্দোলনের মুখে পুরো চলচ্চিত্র পরিবার কাজ বন্ধের ডাক দেয়। ঘোষণা দেয়—আন্দোলনে সমর্থন না দিয়ে যদি কেউ কাজ করে, তাহলে তাকে বয়কট করা হবে।”

পপির কারণে আটকে আছে একাধিক সিনেমার কাজ। এর মধ্যে রয়েছে—‘ভালোবাসার প্রজাপতি’ (পরিচালক: রাজু আলীম), ‘কাঠগড়ায় শরৎচন্দ্র’ (পরিচালক: আরিফুর জামান আরিফ)
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ‘কালা দুনিয়া’ সিনেমা থেকে বাদ দেওয়া হয় পপি ও ওমর সানীকে। কারণ ব্যাখ্যা করে ওয়াকিল আহমেদ বলেন, “আমি কক্সবাজারে ৩২ দিন শুটিংয়ের মহাযজ্ঞ আয়োজনে ব্যস্ত। বিশাল ইউনিট নিয়ে পপি, সানী, রেহানা জলি, আফজাল শরীফসহ আরো কয়েকজন মূল শিল্পীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। মানবিক ও অর্থনৈতিক—দুই কারণেই আমার শুটিং প্যাকআপ করে ঢাকায় ফিরে আসা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরবর্তী তিন দিনের মধ্যেও পপি ও সানী কক্সবাজারে পৌঁছুলেন না। তখন পপির জায়গায় নেহা এবং সানীর জায়গায় ইলিয়াস কোবরাসহ আরো কয়েকজন শিল্পী অদলবদল করে মুভির শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফিরে আসি। প্রস্তুতি শেষে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে সিনেমাটি মুক্তি দিই।”
সেই সময়ে প্রয়াত চাষী নজরুল, ডিপজল, রুবেল ও তারেক সিকদারসহ অনেকের সহযোগিতা পেয়েছিলেন ওয়াকিল আহমেদ। সেই সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন এই নির্মাতা। ‘কোটিপতি’ ও ‘কালা দুনিয়া’ সিনেমার প্রযোজক ছিলেন পুরান ঢাকার সাহিদুর রহমান সাহিদ।

পপির চলচ্চিত্রে ফেরা অনিশ্চিত! গত বছরের শুরুর দিকে এ অভিনেত্রী বলেন—আমি সব কিছু থেকে দূরে চলে গেছি। মানুষ কত দিনই বাঁচে! যে কয়দিন বাঁচি, সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। একটু ভালো থাকতে চাই। একটু ভালো খেতে চাই, আল্লাহ-খোদার নাম নিতে চাই
পরবর্তীতে পপির সঙ্গে একটি কাজ করার অভিজ্ঞতা জানান ওয়াকিল আহমেদ। তিনি বলেন, “পরিচালক ও নায়িকা হিসেবে পপির সঙ্গে আমার কোনো মুভি না হলেও মুভিরই অন্য একটা ভালো কাজ হয়েছে। জনপ্রিয় বিনোদন সাংবাদিক ইমরুল শাহেদ প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে প্রায় জোর করেই তার মুভির চিত্রনাট্যকার হিসেবে দায়িত্ব দেন আমাকে। প্রফেশনাল স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে সেই আমার শুরু। লেখা হয় ‘কারাগার’। নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন পপি। পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কালাম কায়সার।”
রুপালি জগতের ঝলমলে জীবন থেকে এখন দূরে রয়েছেন পপি। ওয়াকিল আহমেদ স্বপ্ন দেখেন পুনরায় লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনে ফিরবেন এই অভিনেত্রী। তার ভাষায়, “কারাগার’-এ সুঅভিনয়ের সুবাদে পপি অর্জন করেন তার জীবনের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার গর্বে আমিও গর্বিত, আনন্দিত। পপি এবং আমি—আমরা দুজনেই এখনো ক্যামেরার সামনে-পেছনে কাজ করছি। এখনো মনে মনে স্বপ্ন দেখি, হঠাৎ আগামী কোনো সকালে কিংবা সন্ধ্যায়, আঁধারের বুক চিরে আলোর উৎসবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো পপি…। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করে বলছি—লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন…!”

২০২৫ সালে চলচ্চিত্রে ফেরার আশ্বাস দিয়ে পপ বলেন—চলচ্চিত্র থেকে সাময়িক বিরতিতে ছিলাম। এখন আবার কাজের কথা ভাবছি। সন্তান জন্মের পর একটু মুটিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু এখন অনেকটা ঠিক আছি। যেহেতু দীর্ঘ একটা গ্যাপ হয়েছে, তাই যে কোনো কাজ দিয়ে ফিরতে চাই না। ভালো কিছু দিয়েই ফিরতে চাই
প্রাণবন্ত অভিনয়ের জন্য পপি দর্শকদের মুঠো মুঠো ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তার ঝুলিতে জমা পড়েছে বাচসাস এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই অভিনেত্রী তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। পপি অভিনীত জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমাগুলো হলো—‘কারাগার’ (২০০৩), ‘মেঘের কোলে রোদ’ (২০০৮) এবং ‘গঙ্গাযাত্রা’ (২০০৯)।