বিনোদন ডেস্ক || ভারতের হরিয়ানার হিসার জেলার ছোট্ট একটি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জাট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মল্লিকা শেরাওয়াত। বিজ্ঞাপনচিত্র দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। মুম্বাইয়ে পাড়ি জমানের পর ধীরে ধীরে বলিউডে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। বোল্ড ফ্যাশন, স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব, প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। তবে মল্লিকা সিনেমায় পা রাখুক, তা নিয়ে তীব্র আপত্তি ছিল তার পরিবারের। তারা তার সাহসী লুক ও পেশাগত সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তাই তাকে একাই সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
বলিউডে পরিচিতি পাওয়ার আগে মল্লিকা শেরাওয়াত ছিলেন, হরিয়ানার ছোট্ট গ্রাম মোথের একজন তরুণী; রীমা লাম্বা নামে পরিচিত ছিলেন। বিনোদন জগতে তার যাত্রার গল্প কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে প্রথম বিয়ে-বিচ্ছেদের গল্প অনেকটাই অজানা। মাত্র ২১ বছর বয়সে জেট এয়ারওয়েজের পাইলট করন সিং গিলকে বিয়ে করেন। তখনো রীমা লাম্বা নামে পরিচিত ছিলেন।

করন সিং গিলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মল্লিকা। তবে পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দুই পরিবারের সদস্যরা বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে বিনোদন জগতে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তাদের সংসার ভেঙে যায়।
বছরের পর বছর নিজের বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে নীরব ছিলেন মল্লিকা। ২০০৯ সালে ‘স্টারডাস্ট’ মল্লিকার জীবনের অপেক্ষাকৃত অজানা অধ্যায়টি বের করে আনার পদক্ষেপ নেয়। সে সময় ম্যাগাজিনটির প্রতিবেদক তার চাচা সুশীল লাম্বার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি করনের সঙ্গে মল্লিকার সম্পর্ক, তাদের বিবাবিচ্ছেদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন।

স্মৃতিচারণ করে মল্লিকার চাচা সুশীল লাম্বা বলেন, “মল্লিকা ও করনের বন্ধুত্ব যখন গভীর হতে শুরু করে, তখন তারা দ্রুত বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন।” বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে সুশীল লাম্বা বলেন, “এটি ছিল প্রেম ও পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে। দুই পরিবারের সবাই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের পর দিল্লিতে তাদের জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।”
মল্লিকা সবসময়ই খ্যাতি ও আর্থিক সাফল্য অর্জনের স্বপ্ন দেখতেন। এ তথ্য স্মরণ করে সুশীল লাম্বা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই তার ধনী ও বিখ্যাত হওয়ার ইচ্ছা ছিল। সে গিলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিবাহিত জীবন তার জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাই সে বিয়ের বন্ধন থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার বাবা-মা থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ির সবাই, তার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। এ নিয়ে সবার সঙ্গে তার বড় ধরনের ঝগড়া হয়।”

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার নিয়ে মল্লিকার আকাঙ্ক্ষা ও জীবনযাপন নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়। এ বিষয়ে সুশীল লাম্বা বলেন, “আমরা যতটুকু শুনেছি, তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে চলচ্চিত্রে কাজ করতে দিতে আগ্রহী ছিলেন না। রাতে বাইরে থাকা, পার্টি করাও তারা একেবারেই পছন্দ করতেন না। ফলে রীমা ও করণের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। সম্ভবত, এটাই তাদের সংসার ভাঙার মূল কারণ।”
‘স্টারডাস্ট’ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে মল্লিকার সাবেক শাশুড়ির সঙ্গেও কথা বলে। প্রথমে ‘মল্লিকা শেরাওয়াত’ নামটি চিনতে পারেননি। পরে তিনি জানান, তাদের পরিবারে ‘রীমা লাম্বা’ নামে পরিচিত ছিলেন ‘মল্লিকা’। সাবেক পুত্রবধূ সম্পর্কে মল্লিকার শাশুড়ি বলেন, “সে আমার পুত্রবধূ ছিল। আমরা সবাই তাকে খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু পরবর্তীতে তার আচরণ, স্বাধীনচেতা মনোভাব আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে থাকে।”

খানিকটা ব্যাখ্যা করে মল্লিকার প্রাক্তন শাশুড়ি বলেন, “আমরা এমন একজন মেয়ে চেয়েছিলাম—যে নিজের চিন্তাভাবনায় স্বাধীন হবে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবারের প্রয়োজন ও দায়িত্বও বুঝবে। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে আলাদা। সে বিনোদন জগতে ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিল।”
মল্লিকার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তার চাচা সুশীল লাম্বা। তার কথা শতভাগ সঠিক। কিছুদিন আগে টাইমস ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মল্লিকা শেরাওয়াত বলেন, “যারা বলেন, ‘টাকাই সবকিছু নয়’, তারা মিথ্যা বলেন। আপনি যখন স্বাধীন, নারী-পুরুষ যেই হোন না কেন, টাকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনাকে বিল পরিশোধ করতে হয়, একটি জীবনযাপনের ধারা বজায় রাখতে হয়।”

নিজেকে স্বনির্ভর নারী হিসেবে উল্লেখ করেন মল্লিকা শেরাওয়াত। তার ভাষায়, “আমি টাকা উপার্জন করতে ভালোবাসি, কাজ করতে ভালোবাসি এবং নিজের জন্য নিজেই হীরা কিনতে ভালোবাসি।”
মতের অমিল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মল্লিকা ও করন নিজ নিজ পথ বেছে নেন। তবে এই সংসার ভাঙার পর মল্লিকা আর বিয়ে করেননি বলে জানা যায়। অন্যদিকে, করন নতুন করে জীবন শুরু করেন। সম্পর্কে জড়ান এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ৪৯ বছর বয়েসি মল্লিকাও অতীত পেছনে ফেলে ব্যস্ত জীবন পার করছেন।
২০০৩ সালে ‘খোয়াইশ’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউড সিনেমায় পা রাখেন মল্লিকা। ‘মার্ডার’ সিনেমার মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। এরপর ‘ওয়েলকাম’, ‘প্যায়ার কা সাইড এফেক্ট’, ‘আপ কা সুরুর’, ‘ডাবল ধামাল’সহ অনেক হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এছাড়া জ্যাকি চ্যানের সঙ্গে ‘মিথ’। পরবর্তী সময়ে ‘পলিটিক্স অব লাভ’, ‘টাইম রাইডার্স’-এর মতো আন্তর্জাতিক সিনেমায় দেখা গেছে তাকে। ২০২৪ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা ‘ভিকি আউর বিদ্যা কা ওয়ালা ভিডিও’।
*টাইমস ইন্ডিয়া অবলম্বনে