আন্তর্জাতিক ডেস্ক || ভারতে ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৪৩টি আসনের মধ্যে ২০২টি জিতে বিশাল বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু তার ঠিক ৯ মাস পরেই বিহারের রাজনীতির ময়দানে বড় ধাক্কা খেল বিজেপি।
সোমবার (৩ আগস্ট) বিজেপির দীর্ঘকালের সবচেয়ে নিরাপদ আসন হিসেবে পাটনার বাঁকিপুুর বিধানসভা নির্বাচনে হারের মুখ দেখতে হয়েছে বিজেপিকে। জন সুরাজ পার্টির (জিএসপি) প্রার্থী প্রশান্ত কিশোরের কাছে হেরেছেন বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহা।
প্রশান্ত কিশোরের প্রতিষ্ঠিত জিএসপি পার্টি এর আগে ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একটি আসনেও জিততে না পারলেও, এবার উপনির্বাচনে প্রশান্ত কুমার প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়েই বাজিমাত করলেন।
সোমবার ভোট গণনার শুরু থেকেই বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান প্রশান্ত কিশোর। চূড়ান্ত গণনায় প্রশান্ত কিশোর বিজেপির প্রার্থীকে প্রায় ১৯ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে এই ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করেছেন। যেখানে জাতীয় জনতা দল (আরজেডি) প্রার্থী অনেক পেছনে থেকে তৃতীয় স্থানে দৌড় শেষ করেছেন।

বিহারে উপনির্বাচনে জন সুরাজ পার্টির প্রথম বিজয়ে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশান্ত কিশোরের এই জয় কেবল তার জন্য এক বিশাল মাইলফলক নয়, বরং বিজেপির নীতি ও নেতৃত্বের জন্য এটি এক কঠিন সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্ট পোস্ট।

বিজেপির সম্রাট চৌধুরী বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচনি পরীক্ষা। উপনির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়া ইঙ্গিত দেয়, শাসকদলের নতুন নেতৃত্বের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে।
বাঁকিপুর আসনটি গত প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছিল। ১৯৯৫ সালে নিতিন নবীনের বাবা কিশোর প্রসাদ সিনহা এই আসন থেকে জয়ী হয়ে বিজেপির আধিপত্যের সূচনা করেন। তার প্রয়াণের পর ২০০৬ সালে উপনির্বাচন থেকে শুরু করে টানা পাঁচবার এই আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন সাবেক বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন। নিতিন নবীন সম্প্রতি রাজ্যসভায় মনোনীত হওয়ায় আসনটি খালি হয়। নিতিন নবীনের ছেড়ে দেওয়া এবং বিজেপির অন্যতম নিরাপদ নগরীয় এই আসনে হার বিজেপির দলীয় মর্যাদায় সরাসরি আঘাত হেনেছে।
মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর ওপর অনাস্থা প্রকাশ
নীতিশ কুমারের পর বিহারে বিজেপির সম্রাট চৌধুরী নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচনি পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁকিপুরের উপনির্বাচনটি ছিল বস্তুত সম্রাট চৌধুরীর সরকারের জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের ওপর জনগণের এক প্রকার ‘গণভোট’। সেখানে বিজেপির হেরে যাওয়া নির্দেশ করে যে, শাসকদলের নতুন নেতৃত্বের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে।
তরুণ সমাজ ও ‘জেন-জি’ ভোটারদের অসন্তোষ
বিজেপির এই পরাজয়ের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো তরুণ ভোটারদের মনোভাব। সর্বভারতীয় পর্যায়ে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে তরুণদের যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তার ঢেউ বিহারেও পড়েছিল। প্রশান্ত কিশোর তার প্রচারে কোনো আবেগীয় ইস্যু তুলে না ধরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নাগরিক সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিজেপি তাদের ঐতিহ্যবাহী তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটব্যাংকের বড় একটি অংশ হারিয়েছে।
বিরোধী শিবিরের নতুন সমীকরণ
আরজেডি-কে পেছনে ফেলে প্রশান্ত কিশোরের দল দ্বিতীয় নয়, বরং সরাসরি এক নম্বর বিকল্প হিসেবে উঠে আসায় রাজ্য রাজনীতির মোড় নতুন দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়া ‘জন সুরাজ’ যে বিহারে বিজেপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, বাঁকিপুর তার প্রমাণ দিল।
বিহারে বিজেপির সম্রাট চৌধুরী নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচনি পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁকিপুরের উপনির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, শাসকদলের নতুন নেতৃত্বের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে
বিজেপির সম্রাট চৌধুরী বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচনি পরীক্ষা। উপনির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়া ইঙ্গিত দেয়, শাসকদলের নতুন নেতৃত্বের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে।
বাঁকিপুর উপনির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের সাফল্যের কারণ
ফাস্ট পোস্টের মতে, এই জয়ের মূল কারিগর প্রশান্ত কিশোর নিজেই। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি, তবে এবার তিনি সরাসরি নির্বাচনি ময়দানে নামার সাহসিকতা দেখান।
এছাড়া মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তনের সন্ধান করছিল এবং প্রশান্ত কিশোরের মধ্যে তারা সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে। হিন্দুত্ব বা আবেগভিত্তিক প্রচারের বদলে কিশোর শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সমস্যাগুলোর ওপর জোর দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। এর ফলে অনেকেই তাকে একজন ‘অপেক্ষাকৃত ভালো ও সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেএসপি প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর মহল্লা বৈঠক ও সরাসরি গণসংযোগের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি বিজেপির প্রথাগত ‘সামাজিক সমীকরণ’ ভাঙতে সক্ষম হন এবং বিজেপির স্থানীয় নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নেন।
মধ্যপ্রদেশের উপনির্বাচনেও বিজেপির ধাক্কা
সোমবারের দিনটি বিজেপির জন্য সুখকর ছিল না, কারণ মধ্যপ্রদেশের উপনির্বাচনেও দলটি ভালো পারফর্ম করতে পারেনি। দাতিয়া আসনে উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং জয়ী হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে জানান, দাতিয়া বিধানসভা উপনির্বাচন বিজেপির জনপ্রিয়তার একটি গণভোটের মতো। এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে গুজরাটের মাঞ্জালপুর আসনে বিজেপি প্রার্থী সতীশ প্যাটেল জয় ছিনিয়ে এনে কিছু আশার আলো দেখিয়েছেন।
সব মিলিয়ে সোমবারের এই তিন উপনির্বাচন বিজেপির জন্য এক মিশ্র ও বৈপরীত্যপূর্ণ ফলাফল এনে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে দীর্ঘদিনের পরিচিত বিজেপির ভোটব্যাংকের একটি অংশ দলটির ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে, যা পাঞ্জাব ও গুজরাটসহ অন্যান্য রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।