নিজস্ব প্রতিবেদক || রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইন গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিছু ডিলার ও মজুতদার সরবরাহ সীমিত রাখায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
রবিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করে, যা আগের মাসের তুলনায় ৭০ টাকা বেশি। সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর লালবাগ, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডারের জন্য ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
লালবাগের একজন খুচরা এলপিজি বিক্রেতা রাশেদ। তিনি বলেন, “কোম্পানির নির্ধারিত দামে সিলিন্ডারই হাতে আসছে না। ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় সিলিন্ডার মজুত করে বাজারে সংকট সৃষ্টি করছেন।
নিউ মার্কেট এলাকার আরেক বিক্রেতা কাইয়ুম বলেন, “সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা অনেক বেড়েছে। সরবরাহ সেই অনুপাতে নেই। অনেক সময় পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ফলে ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত দামে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “বাজারে কৃত্রিম সংকটের কারণে খুচরা বিক্রেতারাও চাপে রয়েছেন।”
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেলায় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও গভীর রাত ছাড়া গ্যাস মিলছে না। এতে রান্নাবান্না কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার রাত জেগে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেকেই হোটেল-রেস্তোরাঁ বা এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
বকশীবাজারের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, “বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস থাকে না বললেই চলে। তাই এলপিজি ব্যবহার করতে হয়। সরকার যে দাম ঠিক করে দেয়, সেই দামে কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। এখন দাম বাড়ার পর আরো ১০০-২০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মুনতাসির আহমেদ বলেন, “প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দিচ্ছি, কিন্তু গ্যাস পাচ্ছি না। আবার রান্নার জন্য এলপিজি কিনতে গেলেও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে নয়, শিল্পকারখানাতেও পড়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকট সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। ফলে দেশে মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
সরকারি হিসাবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে বাস্তবে এখনো গ্যাস সরবরাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। এ অবস্থায় এলপিজির চাহিদা আরো বাড়ছে। তবে, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ ভোক্তারা দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়েছেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। এদেরকে না থামাতে পারলে বাজার আরো অস্থির হবে। দায়িত্বশীল সবাইকে আরও কঠোর হতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধে বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গ্যাস সংকটের পুরো চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে থাকবে।